স্বাস্থ্য

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা অস্বস্তিকর পেটের পীড়ার ৮টি কারন

এমবিবিএস (৫ম বর্ষ), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। পরিচালক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, হিউম্যান এইড বাংলাদেশ।

স্কুলে যেতে ভালো না লাগলে ফাঁকি দেয়ার যে প্রায় অব্যর্থ অজুহাত ছিলো আমাদের শৈশবের নিত্যসঙ্গী, রবি ঠাকুরের “ইচ্ছাপূরণ” গল্পের সুশীলচন্দ্র থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত হাজারো শিশুর বহুল ব্যবহারেও যে অজুহাত হয়নি পুরনো তার নাম “পেটব্যথা”! ফাঁকিবাজিই হোক বা সত্যিই, পেটের পীড়ায় ভোগেননি এমন মানুষ কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

আজকে যে পেটের অসুখ নিয়ে আমরা কথা বলবো, তার নাম “Irritable Bowel Syndrome” (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম) বা সংক্ষেপে IBS। বাংলায় এর প্রচলিত সহজ কোনো নাম না থাকায় আমরা একে IBS বলেই ডাকবো।

IBS কি?

প্রকৃত অর্থে IBS কোন রোগ নয় বরং কিছু লক্ষণ বা উপসর্গের সমষ্টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:

১. প্রায়ই পেটে কামড় বা মোচড় দিয়ে দিনে তিন থেকে চারবার নরম, পিচ্ছিল পায়খানা হওয়া।

২. পায়খানার ধরনে পরিবর্তন হওয়া। অর্থাৎ কখনো ডায়রিয়া, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা কখনো দুইটাই হওয়া।

৩. প্রায়ই পেটের ভেতর শব্দ অনুভূত হওয়া।

৪. খাওয়ার পরে বদহজম হওয়া বা কিছু খেলেই অস্বস্তি ভাব ও গ্যাস হওয়া।

৫. খাবার পরই প্রচণ্ড পায়খানার বেগ পাওয়া, পেটে মোচড় দেয়া ও ব্যথা অনুভূত হওয়া। সাধারণত মলত্যাগের পর ব্যথা সেরে যাওয়া।

৬. হঠাৎ করে পায়খানার বেগ হয়েই তা তীব্র হয়ে যাওয়া।

৭. মলত্যাগ করে আসার পরও পেট পরিষ্কার হয়নি এমন অনুভূতি হওয়া এবং কিছুক্ষণ পরই আবার বেগ হওয়া।

তবে মজার ব্যাপার হলো, এতসব সমস্যা থাকার পরও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তেমন কোন অস্বাভাবিকতা কিন্তু আপনার অন্ত্রে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, অন্ত্রের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকা সত্ত্বেও যদি আপনার উপরের সমস্যাগুলো থাকে তবেই তাকে IBS বলা যাবে।

IBS এর কারণঃ

আরো পড়ুন  চোখ ওঠা রোগ বা কনজাংটিভাইটসের ৭টি লক্ষণ ও করণীয়

আগেই বলা হয়েছে IBS হলে অন্ত্রের অবস্থা প্রায় স্বাভাবিকই থাকে। তাহলে এসব উপসর্গের কারণ কি? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের বরাবরই গলদঘর্ম হতে হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কারণ আজও রয়ে গেছে অজানাই।  তবে বিজ্ঞানীরা বেশ ক’টি সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

১. গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অবসাদ, হতাশা ও বিষণ্ণতায় ভুগেন, তাদের IBS এ ভোগার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

২. কোন বিশেষ ধরণের খাবারের প্রতি খাদ্যনালীর সংবেদনশীলতা থাকে। ব্যক্তিভেদে খাবারের ধরণ ভিন্ন হয়ে থাকে। গবেষণা অনুযায়ী, অ্যালকোহল, কফি, চকলেট, কোমল পানীয়, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, মশলাদার খাবার, অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার ইত্যাদি খেলে IBS হতে পারে।

৩. খাদ্যনালী থেকে মস্তিষ্কে এবং মস্তিষ্ক থেকে খাদ্যনালীতে যে স্নায়বিক সংকেতগুলো আসা যাওয়া করা জরুরি তার পথে কোথাও বিঘ্ন ঘটলে।

৪. খাদ্যনালীর (প্রধানত বৃহদান্ত্রের) স্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণের ছন্দপতন। সংকোচন-প্রসারণ দ্রুত হলে পানি শোষিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় মলের সাথে পানি বেরিয়ে যায় বেশি। যার ফল হয় ডায়রিয়া। আবার উল্টোটা ঘটলে অতিরিক্ত পানি শোষিত হয়ে ঘটায় কোষ্ঠকাঠিন্য।

৫. ব্যথার প্রতি খাদ্যনালীর অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা থেকেও IBS হতে পারে।

৬. মেয়েদের মাসিক চলাকালীন সময়ে হরমোনের প্রভাবেও কখনো কখনো IBS এর উপসর্গগুলি দেখা দিতে পারে।

৭. অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ বা অন্ত্রে বসবাসকারি উপকারি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতিগুলোর মধ্যে বড় ধরণের পরিবর্তনও IBS এর জন্য দায়ী হতে পারে।

৮. IBS বংশগত কারনেও হতে পারে।

কাদের ঝুঁকি বেশি?

১. যাদের বয়স ৩৫ বছরের কম।

২. নারীদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

৩. যাদের পরিবারের কোন সদস্য IBS- এ আক্রান্ত এবং

৪. যারা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।