রিসার্চ আপডেট

গবেষণা বলছে ভাত খেলেও কমবে ক্যালরি!

এমবিবিএস (৫ম বর্ষ), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ

ভাত বাঙালির প্রধান খাবার। খাবার টেবিলের অপরিহার্য উপাদান। শুধু বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, পৃথিবীর অনেক দেশেই ভাত প্রধান খাবার। সধারণত ‘ভেতো বাঙালি’ বলা হলেও ক্যারিবীয় বা আমেরিকানরাও কিন্তু বেশ ভালো পরিমাণেই ভাত খায়।

ভাতের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটা যেকোন খাবার বা তরকারির সাথেই খাওয়া যায় এবং সস্তা ও সহজলভ্য। একারনেই ভাতের চাহিদা এত বেশি। কিন্তু মুশকিল হল, মাত্র এক কাপ ভাতেই প্রায় ২০০ ক্যালরি এনার্জি থাকে। যা ডায়াবেটিস ও স্থুলতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অথচ ভাত খাওয়ার অভ্যাস বদল বা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে আনা অনেকের পক্ষেই সহজ নয়। বিশেষ করে আমাদের এখানে ডায়াবেটিস রোগীরা কোন ভাবেই ভাতের পরিমাণ কমানোর ডাক্তারি সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন না।

ফলে অনেকেই জানতে চান, ক্যালরির পরিমাণ কমিয়ে ভাতকে আরো স্বাস্থ্যকর উপায়ে গ্রহণ করার কোন উপায় আছে কি?

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার কয়েকজন গবেষক ভাত রান্নার নতুন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তাদের দাবী, এ পদ্ধতিতে রান্না করে ভাতের ক্যালরির মান ৫০ ভাগ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

সাধারণত আমাদের বাসা-বাড়িতে যেভাবে ভাত রান্না হয় তারাও প্রায় সেভাবেই রান্না করেছেন। শুধু চুলার উপর পানি ফোটার পরে, চাল দেয়ার আগে ঐ পানিতে চালের ওজনের ৩ ভাগ পরিমাণ নারকেল তেল যোগ করেছেন। এরপর রান্না হয়ে গেলে পুরো ১২ ঘন্টা ধরে তা রেফ্রিজারেটরে রেখে ঠান্ডা করেছেন। ব্যাস, এতেই নাকি কমে যাবে ক্যালরির পরিমাণ। এই ভাত ঠাণ্ডা অবস্থায় বা গরম করেও খাওয়া যাবে।

আমরা যেসব শর্করা জাতীয় খাবার খাই তার অনেকগুলোই সহজে হজম হয়ে যায়। তারপর প্রথমে গ্লুকোজ ও পরে গ্লাইকোজেন হিসেবে দেহে জমা হতে থাকে। তবে বেশ কিছু শর্করাজাতীয় খাবার আমাদের দেহে সহজে হজম হয় না। ফলে ঠিকমত জমাও হয় না। এই শেষোক্ত শর্করাগুলোই শরীরের জন্য স্বাস্থ্যকর বলে বিবেচিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র রান্নার পদ্ধতি পরিবর্তন করেই খাবারে শর্করার পরিমাণ পরিবর্তন করা সম্ভব। যেমন আলু, মিষ্টি আলু বা মটরশুঁটি সেদ্ধ করলে এতে সহজপাচ্য শর্করার পরিমাণ বাড়ে। অর্থাৎ এগুলো তখন সহজে হজম হয়। তাই এগুলো ততটা স্বাস্থ্যকর নয়। মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা রেস্টুরেন্টে যে ফ্রায়েড রাইস খাই তা বাড়ির ভাতের চাইতে বেশি স্বাস্থ্যকর! কেন? কারন বিশেষ পদ্ধতিতে রান্নার কারনে এতে সহজে হজমযোগ্য শর্করার পরিমাণ কমে যায়।

আরো পড়ুন  সুস্থতার জন্য ৬টি উপকারী পুষ্টিতথ্য

শ্রীলংকার গবেষকরা মোট ৩৮ ধরণের চালের ওপর ৮টি পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখতে পান যে, ভাত রান্নার ঠিক আগে যদি এতে একটি চর্বি জাতীয় খাবার যোগ করা হয় তবে ভাতের শর্করার গাঠনিক পরিবর্তন হয় এবং একবার ঠাণ্ডা করে নিলে এই পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে যায়। পরে খাওয়ার সময় গরম করে নিলেও কোন সমস্যা নেই। ভোজ্য তেলের মধ্যে নারকেল তেল সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় তারা গবেষণায় নারকেল তেলই ব্যবহার করেছেন। তবে সূর্যমুখী বীজের তেল দিয়েও একই ফল পাওয়া যাবে বলে তাদের বিশ্বাস। রাসায়নিক গাঠনিক দিক থেকে যা প্রায় সয়াবিন তেলের মতোই। আমাদের দেশে রান্নায় মূলত সয়াবিন তেলই ব্যবহার করা হয়। সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করে একই ফল পাওয়া গেলে সয়াবিন তেল ব্যবহার করেও ভাতের ক্যালরি কমানো সম্ভব হবে।

স্থুলতা বর্তমান পৃথিবীতে একটি অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। প্রত্যক্ষ ক্ষতি ছাড়াও পরোক্ষভাবে স্থুলতা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ অনেক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ভাতের সাথে স্থুলতার সরাসরি সম্পর্কের কারণে অনেকে ডাক্তারের পরামর্শে, কেউবা আবার নিজ উদ্যোগেই ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন বা পরিহার করেছেন। কেউবা দাওয়াতে বা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে মুখ ভার করে থাকছেন। আবার অনেকের পক্ষেই খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে ভাতের বদলে অন্য কিছু গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। অর্থনৈতিক কারনেও ভাতের বদলে অন্য কিছু খাওয়া দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে শুধু রন্ধন প্রণালী পরিবর্তন করেই যদি পেট ভরে ভাত খাওয়া যায় তবে মন্দ কি?

“মাছে-ভাতে বাঙালি”র মাছ তো আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। ভাতটাকে ধরে রাখার একটা চেষ্টাতো অন্তত এবার করাই যায়!