লাইফস্টাইল

চা-কফি কখন খাবেন ?

চিকিৎসক, চিন্তক ও স্বাস্থ্য বিষয়াদির লেখক।

খুব শীত পড়েছে চারিদিকে। শীতের এসব দীর্ঘ রাতে তাড়িয়ে তাড়িয়ে কফি খাওয়া মিস করেন অনেকে। কিন্তু চা ও কফির টাইমিংটা কেমন হওয়া উচিত? কখন কখন এবং কি পরিমাণে ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত তা নিয়েই আলাপ করব এখন।

চা এবং কফিতে পাওয়া যায় ক্যাফেইন। ক্যাফেইন হলো দুনিয়াব্যাপী সবচে বেশি কনজিউম করা সাইকো-একটিভ সাবস্টেন্স বা মানসিকভাবে চাঙ্গাকারী উপাদান। আজকাল অফিস-আদালতেও কফিমেকার বসানো থাকে। ঘুম আসছে বা বোরিং লাগছে? খেয়ে নিন এক কাপ চা কিংবা কফি।

সময়টা ব্যস্ততার। তাই জেগে থাকা, একটিভ থাকা খুব জরুরি আজকাল। এতো কাজ! এতো দায়িত্ব! তাছাড়া রাতজেগে সময় কাটানোর জন্য ‘ফেসবুক’ তো আছেই। তো জেগে থাকতে একটা কিছু তো চাই। হোক তা কফি কিংবা চায়ের বেশে ক্যাফেইন।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, ক্যাফেইন কিন্তু একধরনের ওষুধি উপকরণ। শরীরের উপর কাজ করবার জন্য ওষুধের একটা নির্দিষ্ট অবস্থা দরকার। সেই অবস্থাটাও ঠিকঠাক তৈরি হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর তার জন্য ওষুধ বা এই ধরনের উপকরণ হিসেব করেই খাওয়া উচিত।

মস্তিষ্ক বিজ্ঞানীদের মতে, কফি ঠিকঠাকমতো খেতে হলে আপনাকে ক্রনোফার্মাকোলজী জানতে হবে। মানে, আপনার শরীরবৃত্তীয় রসায়ন (বডিকেমিস্ট্রি) কেমন এবং দেহের ভিতর তার সমন্বয় (সিনক্রোনাইজেশন) কিভাবে হয়- এসবের উপর গুরুত্ব দিয়েই ক্যাফেইন গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ এইসব চা-কফি খেতে হবে।

আমাদের শরীরের একটা নিয়মতান্ত্রিক বিষয় আছে। আল্লাহ্ প্রদত্ত রুটিন, যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলে সার্কেডিয়ান ক্লক। ব্রেইনের হাইপোথ্যালামাসের সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস নামের একটা ছোট্ট অংশ এই ক্লক বা ঘড়ি নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের ঘুম, জাগরণ, খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজনীয়তা, এনার্জির ব্যবহার, সুগার হোমিওস্টেসিস সবকিছুই এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এমনকি আমাদের জাগিয়ে রাখে যে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন যা স্ট্রেস হরমোন নামে পরিচিত, সেই “কর্টিসল” হরমোনটিকেও এই নিউক্লিয়াস নিয়ন্ত্রণে রাখে। কর্টিসল সাধারণত স্ট্রেসের সময় বা লো ব্লাড গ্লুকোজের রেসপন্স ইত্যাদিতে বেড়ে থাকে। এটি আমাদের জাগিয়ে রাখতে বা একটিভ রাখার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। যতক্ষণ সে আছে, ততক্ষণ নিজের ওপর বাড়তি উদ্দীপনা চাপিয়ে দেবার কোন দরকার নেই।

আরো পড়ুন  হার্ট বা হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে ৭টি করণীয়

গবেষকদের দাবী, সুস্থ অবস্থায় শরীরে কর্টিসল হরমোন তৈরি করবার স্বাভাবিক সময় হলো সকাল আটটা থেকে সকাল নটা। এরপর দুপুর বারোটা থেকে একটা এবং বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে ছয়টা। এখন বলুন, যখন কর্টিসল ঠিকঠাক মত কাজ করে তখন কি চা-কফি খাওয়া উচিত? না, উচিত নয়। এটা ভুল সময়। কিন্তু বেশিরভাগ লোক তো সকাল বা বিকালের এই সময়টাতেই চা-কফি খেয়ে নেয়!

প্রকৃতপক্ষে যখন কর্টিসল সামান্য হেলে পড়বে তখনই আপনার কফি বা চা খাবার আসল সময়। অর্থাৎ কর্টিসলের পরবর্তী স্বাভাবিক নিঃসরণের আগের সময় পর্যন্ত চা-কফি খেতে পারেন। নইলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী অপ্রয়োজনে খাওয়া ওষুধটির প্রতি আপনার একধরণের টলারেন্স গড়ে উঠবে। এটা ওষুধের কার্যকারিতা একদমই কমিয়ে দেবে। তথা এতো আশার কিংবা উদ্যমের চা-কফির গুণও যথাযথ কাজে লাগবে না।

সব চাইতে বড় যে সমস্যাটা হবে তা হচ্ছে, ক্যাফেইন কর্টিসলের প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং শরীর ক্যাফেইনকে কর্টিসলের বিকল্প ধরে নিয়ে ক্যাফেইনের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে। যা খুব মারাত্মক। এভাবেই ভুল করে আমাদের ডিপেণ্ডেন্স বা নির্ভরশীলতা তৈরী হয়।

তাই শরীরকে তার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দিন। প্রয়োজন হলে চা কিম্বা কফি খেতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন হয় সময়মতো। এই ধরুন, সকাল সাড়ে দশটা থেকে সাড়ে এগারোটা। দুপুরে দুইটা থেকে পাঁচটা। আর রাতে খুব প্রয়োজন না হলে ঘুমটাকে তাড়াবেন না। ঘুম আসতে দিন, স্বপ্ন দেখতে থাকুন। সকাল হোক সুন্দর, প্রাকৃতিক। নেশায় নয়, প্রয়োজনেই থাকুক চা-কফি-ক্যাফেইন, উপভোগ্য হোক শীতের সময়।