বিশ্লেষণ

চিকিৎসাসেবা বিষয়ে চে গুয়েভারা

চিকিৎসক, বিপ্লবী ও কবি। জন্ম: ১৯২৮, আর্জেন্টিনা এবং মৃত্যু: ১৯৬৭, বলিভিয়া।

কিউবান বিপ্লবি চে গুয়েভারা ১৯৫৩ সালে ইউনিভার্সিটি অফ বুয়েনস আয়ারস থেকে  চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চিকিৎসা সেবায়ও নিয়োজিত ছিলেন বেশ কিছুকাল। ১৯৬০ সালের ১৯ আগস্ট কিউবার বামপন্থি বিপ্লবী বাহিনীর চিকিৎসা বিভাগের কর্মীদের উদ্দেশ্যে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। বক্তৃতাটির একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত রুপ প্রকাশিত হয় প্রথমে কিউবায়। পরে ইংরেজি অনুবাদে তা ইউএসএ’র সিবিএস কর্পোরশেনের একটি প্রকাশনা সংস্থা Simon and Schuster থেকে প্রকাশিত বই Venceremos! The Speeches and Writings of Che Guevara -তে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। শিরোনাম ছিল ‘On Revolutionary Medicine’।

চে গুয়েভারার এই বক্তব্য তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর চিকিৎসকদের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক। বক্তৃতা থেকে সংক্ষিপ্ত অংশ বাংলায় তরজমা করে তুলে দিচ্ছি এখানে;

লাতিন আমেরিকার প্রায় প্রতিটি দেশেই আমি ঘুরেছি। প্রথমে ছাত্র, পরে চিকিৎসক হিসাবে। শুধু হাইতি ও সান্তা ডমিনিগোতে যাওয়া হয় নাই। বিরামহীন ভ্রমনের ফলে এই দেশগুলোর হাল-হাকিকত খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে দারিদ্র্য ও অর্থাভাবে ছোট্ট শিশুদেরও চিকিৎসা করাতে না পারা, ক্ষুধার তীব্রতা, রোগের প্রাদুর্ভাব এসবই আমাকে কষ্ট দিয়েছে। ক্রমাগত ক্ষুধা ও নিপীড়নে জর্জরিত মানুষের যন্ত্রনায় বিস্মিত হয়েছি। এই হচ্ছে আমাদের স্বদেশভূমির পদদলিত শোষিত শ্রেণীর চিত্র। এখানে বাবার কাছে সন্তানের মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক। একটি সাধারণ দুর্ঘটনার মতোই।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সামাজিক ভূমিকা বাড়াতে হবে। একজন ব্যক্তি কি করে সমাজের কল্যাণে কাজ শুরু করতে পারে? কিভাবে সমাজের প্রয়োজনে সব ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাগুলোকে একত্রিত করা যায়? আসলে অন্যান্য বিপ্লবী কাজগুলোর মতো এগুলোও এক একটা সাংগঠনিক কাজ। তবে তা কোন না কোন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। বিপ্লব কখনোই সবার ইচ্ছা বা সবার উদ্যোগকে আদর্শ হিসেবে পেশ করেনা। যদিও অনেকে তা দাবি করেন। পক্ষান্তরে এটা ব্যক্তিসত্তার প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। সেই প্রতিভা বিন্যস্ত করে। তাই আমাদের মধ্য থেকেই কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। চিকিৎসকদের সৃজনশীলতাকে সমাজে সামাজিকভাবেই চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত করবার ব্যবস্থা করতে হবে।

যেকোন একজনমাত্র মানুষের জীবনও দুনিয়ার সব চাইতে বিত্তবান মানুষটির সব সম্পদের থেকেও কয়েক লাখ গুণ বেশি দামি। মানুষের মুখে হাসি আনার আনন্দই আলাদা। এতে যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায় তার মূল্য অনেক বেশি। মানুষের সম্মান এবং কৃতজ্ঞতা অর্জনই হচ্ছে সব চাইতে মহান ও চিরস্থায়ী সম্পদ।

পুরানো ধ্যান-ধারনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে। এটাতো খুবই বেঠিক কাজ যে আমরা মানুষের কাছে গিয়ে বলবো, ‘এইতো আমরা এসেছি। আপনাদের দয়া দেখাতে এসেছি। আপনাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে, আচরণের দুর্বলতাগুলো আর কুসংস্কারগুলো সংশোধন করতে এসেছি।’ আমাদের বরং এর বদলে অনুসন্ধানি মানসিকতা এবং কোমল হৃদয় নিয়ে দিলখোলা ভাবে জনগনের কাছে যেতে হবে। অন্তত নিজে কিছু শিখবার জন্য। কেননা এই মানুষেরাই হচ্ছেন জ্ঞান ও বিচক্ষণতার মহান উৎস।

একসময় আমরা টের পাবো আমাদের প্রচলিত ধারনাগুলো কতটা ভুল ছিল। অথচ এগুলো আমাদের জীবনের অংশে পরিণত হয়েছিল। আমাদের চিন্তার খোরাক ছিল। আমাদের এ ধারনাগুলো বদলাতে হবে। এমনকি পুরানো ও বাতিল সামাজিক বা দার্শনিক ধ্যান-ধারনাও বদলে ফেলতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত চিন্তাগুলোও পরিবর্তন করতে হবে।

চিকিৎসকরা শুধু শহরের বড় বড় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা দিলেই চলবে না। বরং তাদের চাষী বা কৃষকের ভূমিকায় আসতে হবে। নতুন নতুন ফল-ফসল উত্পাদন ও উদ্ভাবনে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে। এর মাধ্যমে সীমিত ও অনুন্নত পুষ্টিকাঠামোতে ভিন্নতা আনতে হবে।

যাদের অনেক আছে আমরা যদি তাদের সম্পদ যাদের কিছুই নেই তাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়ার পরিকল্পনা নেই, প্রতিদিন একটি করে সৃষ্টিশীল কাজের নিয়ত করি, তবে তাই হবে আমাদের সকল সুখের বৈপ্লবিক উৎস। তখনই আমরা জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পাব। অতঃপর সেই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।