বিশ্লেষণ

মনোবিজ্ঞানের মতে ফেইসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশনের ১২টি কারন

এমবিবিএস, এমডি (নিউরোমেডিসিন-কোর্স), এফসিপিএস (মেডিসিন-দ্বিতীয় পর্ব), বিসিএস। মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।

মানুষ সামাজিক জীব। তারা একসাথে থাকতে ভালোবাসে। নিজের মনের কথা বলতে বা নিজস্ব মতামত দিতে ভালোবাসে। একসময় মানুষ আড্ডায় গোল হয়ে বসে নিজের কথা শুনাতো। তারপর কিছু কিছু মানুষ নিজের মতামত ও মনের কথা গল্প-কবিতা বা উপন্যাসে লিখে প্রকাশ করতে শুরু করলো। আর যারা গল্প-কবিতা লিখতে পারেনা তারা আড্ডার আসরে বসেই প্রকাশ করতেই থাকলো নিজস্ব অভিমত। হাল আমলে এই কাজটি সহজ করে দিয়েছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বা মিডিয়াগুলো। বিশেষ করে ফেইসবুক এক্ষেত্রে অনেকেরই আগ্রহের জায়গা। ইদানিং তাই মানুষ মনের কথা বলা ও শেয়ার করাসহ নানা কারনে ফেইসবুকের প্রতি ঝুঁকে যাচ্ছে। বাড়ছে ফেইসবুক অ্যাডিকশন। চলুন দেখা যাক, এই ফেইসবুক অ্যাডিকশনের ব্যাপারে সাইকোলজি বা মনোবিজ্ঞান কি বলে!

১) সহজে কাউকে খুঁজে পাওয়া ও যোগাযোগের মাধ্যম: একসময় মানুষ পায়ে হেঁটে অন্য কারো সাথে যোগাযোগ করতে যেত। এরপর এলো চিঠিপত্র বা ডাকযোগে যোগাযোগ। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে এলো টেলিফোন, মোবাইল ও ইমেইল। আর হাল আমলে এই জায়গা দখল করেছে সোশ্যাল মিডিয়া। তার মধ্যে সবচে জনপ্রিয় ফেইসবুক। ফেইসবুক বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন সহ পরিচিত মানুষের সাথে যোগাযোগের সহজ মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সবাইকে সহজে এবং একসাথে খুঁজে পাওয়া যায়। যোগাযোগ করা যায়।

২) মতামত ও তথ্য শেয়ারের সহজ  মাধ্যম: খুব সহজে মতামত প্রকাশ করতে এবং কোন তথ্য কম সময়ে অনেককে জানাতে চাইলে ফেইসবুকের বিকল্প নেই। ফেইসবুকে একটা আপডেট দিলে ফ্রেন্ডস এণ্ড ফ্যামিলির সবাইকে সহজে জানানো যায়। কারন এখানে সহজেই সবাইকে একসাথে পাওয়া যায়। নিজের চিন্তা-চেতনা শেয়ার করার ক্ষেত্রেও ফেইসবুক অসাধারণ এক মাধ্যম।

৩) সহজেই অনেক কিছু জানার মাধ্যম: মানুষের জন্মগত প্রবণতা হলো অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনা এবং নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করা। ঠিক এই প্রবণতাকেই আরো উসকে দেয় ফেইসবুক। ফেইসবুকে ঢুকলেই বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিবার, অফিস-পেশা, কাজ-কর্ম, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সংবাদ-সাহিত্য-সংস্কৃতি, সংগীত, খেলা-ধূলা, আবহাওয়া, ক্যারিয়ার ইত্যাদি যা খুশি সব সম্পর্কেই সহজে জানতে পারি। এ কারনেও বাড়ছে ফেইসবুক ব্যবহারের অভ্যাস।

৪) দেখে আনন্দ পাওয়ার মাধ্যম: মানুষ যে কয়েকটি উপায়ে আনন্দ পায় তার মধ্যে দেখা অন্যতম একটা মাধ্যম। প্রতিটা মানুষই কিছ না কিছু দেখার মাধ্যমে আনন্দ নেয়ার চেষ্টা করে। আর ফেইসবুকে সবাই নিজেকে খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করে। এটা দেখতে অন্য সবারই ভালো লাগে।

৫) পুরানো স্মৃতিচারণের ভালো মাধ্যম: মানুষ পুরানো সুখকর স্মৃতি স্মরণ করতে সবসময়ই ভালোবাসে। পুরানো বন্ধু-বান্ধব, পুরানো ছবি, পুরানো ভিডিও ইত্যাদি দেখে আনন্দ পেতে সবারই ভালো লাগে। ফেইসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াতে এগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। তাই পুরনো স্মৃতিগুলোকে খুঁজে পেতে মানুষ ফেইসবুকের অ্যালবাম অপশনে যেতে খুব বেশি পছন্দ করে।

৬) কাউকে সহজে বুঝতে: ফেইসবুক এমন একটা মাধ্যম যেখানে সবাই তার চিন্তা-চেতনা, মতামত ও অ্যাকটিভিটি শেয়ার করে। ফলে কারো সম্পর্কে কিছু জানতে ও তার পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব বুঝতে ফেইসবুক বেশ কাজের।

৭) ‘আমি একা নই ‘ এটা বুঝাতে: মানুষ একাকীত্ব পছন্দ করে না। কিন্তু অনেক সময়ই সে একা একা অনুভব করে। ফেইসবুক একাকীত্ব কাটানোর জন্য সহজ এক মাধ্যম। আমরা যখন লোনলি ফিল করি তখন ফেবুতে ঢুকলে পরিচিত কাউকে না কাউকেই পাওয়া যায়। কিংবা অন্য সবার আপডেট দেখা যায়। এটা দ্রুত একাকীত্ব দূর করে দিতে পারে। আর এজন্যই দেখা যায় যে, যারা কখনো সোশ্যাল মিডিয়াতে ছিলো না, প্রেমে ছ্যাঁকা খেলে বা রিলেশন ব্রেকাপ হলে তারাও সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাডিক্টেড হয়ে যায়। তবে ভয়ংকর কথা হলো, ফেইসবুক যেমন একাকীত্ব দূর করে, তেমনি দীর্ঘ সময় ফেইসবুকে থাকলে একাকীত্ব বাড়তে পারে। এমনকি হতাশা বা ডিপ্রেশনও বাড়তে পারে। এই ডিপ্রেশন ও একাকীত্ব দূর করতেই বারবার ফেইসবুকে ঢুকা হয়। যা ফেইসবুক অ্যাডিকশনের অন্যতম কারন।

৮) সোশ্যাল কমিউনিকেশন ও গেইমিং-এর যথার্থ সমন্বয়: ফেইসবুক যে শুধুমাত্র বন্ধুবান্ধবদের সাথে যোগাযোগের ভালো মাধ্যম সেটাই নয়, বরং এটা অনলাইনে গেইম খেলারও ভালো মাধ্যম। হাল আমলের তরুণদের মধ্যে অনলাইনে হেইম খেলার প্রবণতা অনেক। এমন অনেকেই আছে যারা মাসে একটা স্ট্যাটাস না দিয়েও সারাদিন ফেইসবুকে থাকে শুধুমাত্র গেইমিং এর জন্য।

৯) আমরা অন্যদের সাপেক্ষে কেমন তা জানতে: মানুষ যে শুধু নিজের মত শেয়ার করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে আসে তা নয়। নিজের চিন্তা-চেতনা অন্যের সাপেক্ষে কেমন তা জানতে কিংবা কোন বিষয়ে নিজের কমিউনিটির অন্য সবাই কি ভাবছে সেটা জানতেও অনেকে ফেবুতে আসে। সামাজিক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই নিজেকে যাচাই করার প্রবণতা কাজ করে। ফেইসবুক এ কাজে খুবই সহায়ক।

১০) ফেইসবুক ফ্রেন্ড, লাইক ও কমেন্ট সংখ্যা বাড়াতে: আপনি যত বেশি সময় ফেবুতে থাকবেন, তত বেশি অনলাইন ফ্রেন্ডদের সময় দিতে হবে। ফলে অনলাইন সার্কেল বাড়তে থাকবে। আর অনলাইন ফ্রেন্ড সংখ্যা যত বাড়তে থাকবে ততই পপুলারিটি বাড়তে থাকে। পপুলারিটি সব সময়ই অ্যাডিকটিভ। মানুষ সবসময় এটা ভাবতে পছন্দ করে যে ‘আমার কথা মানুষ শুনছে, আমাকে মানুষ মান্য করছে’। আর এক্ষেত্রে ফেইসবুকের বিকল্প নাই। আর সেটা আপনি ফেইসবুক সেলিব্রেটিদের দেখলেই সহজে বুঝতে পারবেন।

১১) অনলাইন প্রেম বা ডেটিং মাধ্যম: ফেইসবুকের মাধ্যমে খুব সহজে অপরিচিত বা পরিচিত মানুষের কাছে চলে যাওয়া যায়। সহজেই মানুষের সাথে যোগাযোগ করা যায়। সামনা সামনি যাকে ভালোলাগার কথা বলতে ভয় হয়, ইনবক্সে তাকে খুব সহজেই প্রপোজ করা যায়। ফলে ইদানিং মানুষ জীবনসঙ্গী বা লাইফ পার্টনার খুঁজে পেতেও ফেইসবুককে ব্যাবহার করছে। এ কারনে যেমন নতুন সম্পর্ক হচ্ছে, তেমনি পুরানো সম্পর্কও ভেঙ্গে যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা সোশ্যাল মিডিয়ার সব থেকে ক্ষতিকর দিক হিসেবে এটাকে চিহ্নিত করেছেন। আর কাউকে ম্যানেজ করে প্রপোজ করতে হলে অনেক সময় অনলাইনে থাকতে হয়। এটাই অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাডিকশনের কারন হয়ে যাচ্ছে।

১২) স্মার্ট হতে ও স্মার্টনেস প্রকাশ করতে: ইদানিং কালে ফেইসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ফ্লিকার, হোয়াটসআপ, ভাইবার ও স্কাইপে আইডি থাকা স্মার্টনেসের অংশ। এখনকার মানুষ কারও সাথে দেখা বা পরিচয় হলেই প্রথম ফেইসবুক আইডির কথা জিজ্ঞেস করে। আর কারো ফেইসবুক আইডি থাকলে সে তাতে ঢুকবেই আস্তে আস্তে এক সময় এটা থেকেই অনেকের অ্যাডিকশন হয়ে যায়।