খাদ্য ও পুষ্টি

শীতের তিন সবজি যা বাড়াবে প্রাণশক্তি

শীতকালীন সবজি, বাঙালির রসনা বিলাসের অন্যতম প্রধান উপাদান। শীত এলেই রং-বেরং-এর সবজিতে ভরে যায় বাজার। রসনা বিলাসের পাশাপাশি এসব সবজির রয়েছে নানা রকম পুষ্টিগুণ। চলুন, শীতের তিনটি পরিচিত সবজি সম্পর্কে জেনে নেই, যেগুলো সহজলভ্য এবং দামে সস্তা। কিন্তু এদের উপকারিতা অনেক এবং বাড়াবে আপনার প্রাণশক্তি।

১. বাঁধাকপিঃ

বাঁধাকপি রান্না করে বা কাঁচা অবস্থায় সালাদ বানিয়েও খাওয়া যায়। এতে চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ খুবই কম। রান্নার পর এক বাটি বাঁধাকপিতে মাত্র ৩৩ ক্যালরি থাকে।অথচ এটা বিভিন্ন ধরনের ভিটামিনের উৎস। এতে রয়েছে ভিটামিন সি ও কে। এছাড়া বাঁধাকপিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম থাকে। এই পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। বাঁধাকপিতে আরো থাকে আয়োডিন, সোডিয়াম, সালফার ও ফসফরাস। অল্প তাপমাত্রায় ভাঁপ দিয়ে সিদ্ধ করে বাঁধাকপি খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে। কারন সিদ্ধ বাঁধাকপি খাদ্যনালীতে বাইল এসিডের সাথে মিলে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়।

বাঁধাকপিতে থাকা ফলিক অ্যাসিড বা ফলেট শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়ায় এবং নিশ্চিত করে গর্ভস্থ শিশুর সুস্থতা। বাঁধাকপিতে উচ্চমাত্রায় সেলুলোজ রয়েছে। যা হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পাক্স্থলীর আলসার রোগীদের ক্ষেত্রে বাঁধাকপির জুস খুবই উপকারী পথ্য। দৈনিক অর্ধেক গ্লাস কাঁচা বাঁধাকপির জুস খেলে দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা থেকেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

ক্যান্সার প্রতিরোধেও বাঁধাকপির ভূমিকা অতুলনীয়। বাঁধাকপির সালফোরাফ্যাইন উপাদান নারীদের স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এর গ্লুকোসিনোলেট নামের উপাদানও ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক। এছাড়া বাঁধাকপিতে আছে সিনিগ্রিন। এটা অন্ত্রনালী, মূত্রনালী ও প্রস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধ করে। তবে বেশি সময় ধরে রান্না করলে বাঁধাকপির ক্যান্সার প্রতিরোধী ক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই এটা হালকা সিদ্ধ করে বা কাঁচা অবস্থাতেই খাওয়া ভালো।

২. ফুলকপিঃ

শীতকালীন সবজির মধ্যে সব চাইতে সহজলভ্য হচ্ছে ফুলকপি। সুস্বাদু এই সবজিতে ক্ষতিকর অক্সালেটের মাত্রা কম। ফলে কিডনি রোগীরাও তা নির্ভয়ে খেতে পারেন। ফুলকপি ভিটামিন সি, এ, ডি এবং কে-এর দারুণ উৎস। এছাড়া এতে রয়েছে ফোলেট, থায়ামিন, রাইবোফ্ল্যাবিন, নায়াসিন, প্যান্টোথেনিক এসিড ও ভিটামিন বি৬।তবে বেশি রান্না করলে ফুলকপির ভিটামিনের মাত্রা কমে যেতে পারে। তাই ভিটামিন পুরোপুরি পেতে হলে হালকা সিদ্ধ করে বা খানিকটা তেল দিয়ে রান্না করে খাওয়া ভালো।

আরো পড়ুন  ডায়বেটিক রোগীদের জন্য উপকারী ১০টি খাবার

ফুলকপিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও লৌহ পাওয়া যায়। যা শারীরিক ঘাটতি পূরণে সহায়ক। এছাড়া ফুলকপিতে রয়েছে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড, যা হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। ফুলকপির কোলিন উপাদান মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশে সহায়ক।

ফুলকপি আঁশজাতীয় খাবার হওয়ায় তা পরিপাকে সহায়তা করে। এমনকি পাকস্থলীর ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতেও বাধা দান করে। বাঁধাকপির মত ফুলকপিতেও ক্যান্সার প্রতিরোধী সালফোরাফ্যাইন থাকে। এছাড়া ফুলকপি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

৩. গাজরঃ

গাজরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন, যা লিভারে গিয়ে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়। ভিটামিন-এ চোখের রেটিনাতে গিয়ে রোডপসিন তৈরী করে। এটা রাতের অন্ধকারে দেখতে সহায়তা করে। এছাড়া বিটা ব্যারোটিন ম্যাকুলার ডিজেনারেশন ও চোখের ছানি পড়া রোগ প্রতিরোধ করে। অকালে বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে তারুণ্য ধরে রাখতেও বিটা ক্যারোটিনের ভূমিকা আছে।

গাজরে বিটা ক্যারোটিন ছাড়াও আছে আলফা ক্যারোটিন ও লুটিন। এগুলো হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং রক্তে কোলেস্টেরল-এর মাত্রা কমায়। গাজর ত্বক ভালো রাখে। প্রাচীনকালে গাজর বেটে তার সাথে মধু মিশিয়ে রূপচর্চায় ব্যবহৃত হত। এখনও ফেসিয়াল মাস্ক হিসাবে এটা অনেক কার্যকর।

গাজর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। গাজরে রয়েছে ভিটামিন সি, লুটিন, সাইকোপিন ইত্যাদি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের সমাহার, যা ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক। নিয়মিত গাজর খেলে ফুসফুস, স্তন, প্রস্টেট ও অন্ত্রনালীর ক্যান্সার থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। গাজর দাঁতের ক্ষয় রোধ করে এবং দাঁত ও মাড়ির সুস্থতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। এছাড়া গাজরের ভিটামিন–এ শরীরের ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণে লিভারকে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ছয়টি গাজর খেলে স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমে।