বিশ্লেষণ

স্বল্প বরাদ্দের বাজেট ও অবহেলিত স্বাস্থ্য খাত

কো-ফাউন্ডার ও সম্পাদক, সুস্বাস্থ্য ২৪।

এ বছর অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের শিরোনাম ছিল, ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ : উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ রচনা’। সমৃদ্ধি অর্জনে ২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি  টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বিশাল অঙ্কের এই বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের জন্য ১২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। টাকার হিসেবে তা গত বছরের তুলনায় ১১৫৮ কোটি টাকা বেশি হলেও জিডিপির অনুপাতে মাত্র ০.৭৩ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাজেটের নূন্যতম ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া উচিত। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৬.৭ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দ ছিল। কিন্তু গত ৮ বছরে তা ২.৪ শতাংশ কমে এ বছর ৪.৩ শতাংশ হয়েছে।

জনপ্রতি বার্ষিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের স্বীকৃত পরিমাণ ৫৪ ডলারের সমান হলেও বাংলাদেশে মাথাপিছু খরচ হয় ২৮ ডলার। তার মধ্যে সরকারের অবদান মাত্র ৯ ডলার। অর্থাৎ কমবেশি ৭০০ টাকা। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে মাথাপিছু বার্ষিক বরাদ্দের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। শ্রীলংকায় ৯৭ ডলার, ভারতে ৫৯ ডলার, নেপালে ৩৩ ডলার এবং পাকিস্তানে জনপ্রতি ৩০ ডলার স্বাস্থ্য সেবায় ব্যয় করা হয়।

বাজেটে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ কমায় মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় দিনকেদিন কমছে। এতে স্বাস্থ্যসেবার মত মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ জনগণ।

এ বছরের বাজেট বক্তৃতায় স্বাস্থ্য খাতের জন্য চারটি অনুচ্ছেদ বরাদ্দ ছিল। এতে কমিউনিটি ক্লিনিক, টেলিমেডিসিন সেবার সম্প্রসারণ, মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গত কয়েক বছরের বাজেটে কমিউনিটি ক্লিনিকের উপর বেশ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সরকার ঘোষিত ১৩ হাজার ৫০০ ক্লিনিকের অবকাঠামো এখনো তৈরি হচ্ছে। এ বছর নতুন করে কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য ১৩ হাজার ৮৬১ মিনি ল্যাপটপ দেয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।  কিন্তু সেখানকার জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি বা ল্যাপটপ পরিচালনার মত প্রযুক্তিগত বিষয়ে সক্ষমতা অর্জনের জন্য কোন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা বলা নেই। তাছাড়া এসব ক্লিনিকে পর্যাপ্ত জনবল ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তাও ঠিকমত নেই। ল্যাপটপের বদলে সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যকর্মী ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সম্ভব হত। এর পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আরো বেশি সুযোগ সুবিধা এবং সেবার গুনগত মান বৃদ্ধি করতে পারলে সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার মান অনেক বেশি বৃদ্ধি পেত।

বাজেটে গরীব, দুস্থ ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিমের কথা বলা হয়েছে। এটা কার্যকর করা গেলে তা মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। এ স্কিমের অধীনে মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়ে কর্মজীবি মায়েদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারী পোশাক শ্রমিকদের এ আওতায় আনা গেলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে। এছাড়া দুর্গম চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপবাসী এবং ভূমিহীন ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকেও এর অন্তর্ভূক্ত করা যায়। এতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে।

বাজেটে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। অথচ এদেশে স্বাস্থ্যখাতের সামগ্রিক ব্যয়ের মাত্র ৩২ শতাংশ সরকারি বরাদ্দ থেকে আসে। বাকি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ খরচ জনগণ নিজেদের পকেট থেকে বহন করে।

কিন্তু উন্নত বিশ্বের চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। নরওয়েতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৮২ শতাংশ সরকার প্রদান করে। কানাডাতে এই হার ৬৫ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৬৩ শতাংশ। এমনকি আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র শ্রীলংকাতেও স্বাস্থ্যখাতের ৪৫ শতাংশ ব্যয় সরকারের পক্ষ থেকে বহন করা হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ ও ‘সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা’ নিশ্চিত করতে হলে সরকারী বরাদ্দ এবং জনগনের ব্যয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা জরুরী।

‘স্বাস্থ্যব্যয় সংক্রান্ত সরকারী কৌশলগত পরিকল্পণা (২০১২-২০৩২)’ অনুযায়ী ২০৩২ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় জনগণের ব্যয় প্রায় অর্ধেক কমিয়ে ৩২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে তার কোন প্রতিফলন দেখা যায় নাই।

স্বাস্থ্যসেবার সাথে ওষুধনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা বেশ হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। ১৯৮২ সালের পর এদেশে ওষুধনীতির কোন পরিবর্তন বা আধুনিকায়ন কিছুই করা হয় নাই। ২০০৫ সালে সরকার একটি খসড়া ওষুধনীতি তৈরী করে। কিন্তু গত দশ বছরেও তা গৃহীত হয় নাই। বিগত কয়েক বাজেটে অর্থমন্ত্রী নতুন ওষুধনীতি প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তার কাঙ্খিত কোন ফলাফল চোখে পড়ে নাই।

এ বছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ‘জাতীয় ওষুধ নীতি ২০১৪’ প্রণয়নের পাশাপাশি ‘ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ’- এর বিভিন্ন বিষয়াদি সংশোধনের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কার্যকর ওষুধনীতি প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কোন বক্তব্য তিনি রাখেননি।

স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে হলে এ খাতে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী জনবলের ক্ষেত্রে সঙ্কটাপন্ন ৫৭টি দেশের একটি। এদেশে এখনো রোগীর অনুপাতে ডাক্তার এবং নার্সের সংখ্যা অনেক কম। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান হচ্ছে ১:৩। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে ১:০.৪৮। যা সত্যিই আশঙ্কাজনক। প্রতি ১০,০০০ জন রোগীর জন্য এখানে ডাক্তার আছেন মাত্র তিন জন। তাই পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল তৈরী ও তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ব্যাপারেও বাজেটে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত। বেসরকারী খাতের ডাক্তারদের উচ্চতর ডিগ্রির প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য অন্তত তিন বছর বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হয়। যা অনেকটাই অমানবিক। তাদেরকে বেতনের আওতায় এনে চিকিৎসা সেবার মানকে আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব।

জলবায়ুর পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা ও রোগ-বালাই বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য উদ্বেগজনক বিষয়। ভৌগলিক অবস্থানগত কারনে বাংলাদেশেও যে কোন সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। ২০১১ সালে গৃহীত জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্য বিপর্যয় ও রোগ-ব্যাধির গতি প্রকৃতি লক্ষ্য রাখা ও তা থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় উদ্ভাবণ’ করার কথা বলা আছে। কিন্তু কার্যত স্বাস্থ্য বাজেটে এ ব্যাপারে কোন বরাদ্দের কথা বলা নাই।

সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প, আবহাওয়াগত পরিবর্তন ও এসবের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের রোগের আবির্ভাব ও স্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনায় রেখে বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া ‍উচিত ছিল।

বিগত কয়েক বছরে স্বাস্থ্যবিষয়ক বেশ কিছু সূচকে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ ও ৫ অর্জনে বাংলাদেশ অনেকের কাছেই অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশু মৃত্যুহার রোধে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা  (৪৮) ছাড়িয়ে গেছে।  ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মাত্র নয় বছরে মাতৃ-মৃত্যুহার ৪০ শতাংশ কমে প্রতি ১০০,০০০ জীবিত শিশু জন্মের বিপরীতে ১৯৪ হয়েছে। গত ছয় বছরে গড় প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৬৫ থেকে বেড়ে ৭১ বছর হয়েছে।

বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়ীকি ‘ল্যান্সেট’ বাংলাদেশের এই অর্জনকে ‘বিষ্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছে। বিষ্ময়কর কারণ স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের ব্যয় খুব সামান্য। এই স্বল্প বরাদ্দ দিয়ে হয়ত বেশ কিছু সূচকে উন্নতি করা গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের স্বাস্থ্যসেবার কিন্তু উন্নয়ন ঘটে নাই। এখনো দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী টাকার অভাবে চিকিৎসার সুযোগ পায় না। মা ও শিশু মৃত্যর হার এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যা এখনো অনেক প্রকট। এখনো ৫৮ শতাংশ বাচ্চা প্রসব হয় অদক্ষ দাইয়ের হাতে।

এছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তন, জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের ধরন বদল হওয়াসহ বিভিন্ন কারনে বেশ কিছু নতুন ও জটিল রোগের আবির্ভাব হচ্ছে। এসব মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহারের দিকেও নজর দেয়া উচিত। তা না হলে স্বাস্থ্য সেবার মতো মৌলিক নাগরিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে।