লাইফস্টাইল

যে ৮টি কারনে লিভারের ক্ষতি হতে পারে

মেডিকেল ডিরেক্টর, ক্রিসেন্ট গ্যাস্ট্রোলিভার এণ্ড জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।

লিভার দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি শরীরের বিভিন্ন কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে। যেমন: বিপাক ক্রিয়া, পুষ্টি উপাদান সঞ্চয়, ওষুধ ও নানা রাসায়নিক পদার্থের শোষণ, রক্ত জমাট বাঁধার উপকরণ তৈরীসহ ইত্যাদি। প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় এক লাখ মানুষ লিভারের বিভিন্ন রোগে মারা যায়। লিভারের রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে: হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস, হেপাটিক অ্যাবসেস বা লিভারে ফোঁড়া হওয়া, ফ্যাটি লিভার বা লিভারে চর্বি জমা হওয়া, লিভার ক্যানসার ইত্যাদি। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ, মদ্যপান, ধূমপান ইত্যাদি কারনে লিভারের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া আরো কিছু বিষয় লিভারের ক্ষতি করতে পারে। চলুন এরকম কিছু বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই-

১. শর্করা ও চিনি জাতীয় খাবার

অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি খাওয়া লিভার বা যকৃতের জন্য বিপদজনক। লিভার ফ্রুক্টোজ থেকে ফ্যাট বা চর্বি তৈরী করে। ফ্রুক্টোজ এক ধরনের শর্করা বা চিনি জাতীয় খাবার। অতিরিক্ত পরিমাণ পরিশোধিত চিনি এবং উচ্চ মাত্রার ফ্রুক্টোজ সম্বলিত সিরাপ লিভারে এক ধরনের চর্বির প্রলেপ তৈরী করে, যা থেকে পরবর্তীতে লিভার রোগ তৈরী হতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে শর্করা ও চিনি জাতীয় খাবার লিভারের জন্য অ্যালকোহলের মতই বিপদজনক। এমনকি অতিরিক্ত ওজন কিংবা স্থূলতায় অক্রান্ত না হলেও চিনি জাতীয় খাবার লিভারের জন্য ক্ষতিকর ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার যেমন: সোডা বা কোমল পানীয়, পেস্ট্রি কেক ও চকলেট খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

২. অতিরিক্ত ওজন

শরীরের অতিরিক্ত চর্বি লিভারের কোষে গিয়ে জমা হতে পারে এবং নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার তৈরী করতে পারে। ফলশ্রুতিতে লিভার ফুলে যায়। সময়ের সাথে সাথে এ অবস্থা থেকে লিভারের কোষগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং ক্ষতচিহ্ন তৈরী করে। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে সিরোসিস। মধ্যবয়স্ক কারো ওজন বেশি হলে কিংবা স্থূলতায় আক্রান্ত হলে এবং এর সাথে ডায়াবেটিস থাকলে ফ্যাটি লিভার হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। তবে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে এই রোগ ঠেকানো সম্ভব।

৩. কোমল পানীয়

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি কোমল পানীয় পান করেন তাদের মধ্যে ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কোমল পানীয় যে ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারন তা প্রমাণিত না হলেও কোমল পানীয় এড়িয়ে চলাটা লিভারের সঠিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্য ভালো।

৪. ট্রান্স ফ্যাট

ট্রান্স ফ্যাট মূলত মানুষের তৈরী চর্বি। এটা প্যাকেটজাত খাবার ও শুকনো খাদ্যপণ্যে থাকে। এসব খাদ্যপণ্যের মোড়কের গায়ে ‘পার্শিয়ালি হাইড্রোজিনেটেড ইনগ্রেডিয়েন্ট’ লেখা থাকে। উচ্চ মাত্রার ট্রান্স ফ্যাট সম্পন্ন খাবার ওজন বাড়ানোর জন্য দায়ী। আর অতিরিক্ত ওজন লিভারের জন্য ক্ষতিকর। এ কারনে যেকোন খাদ্য পণ্য কিনার আগে মোড়কের গায়ে ট্রান্স ফ্যাট সম্পর্কিত কিছু লেখা আছে কিনা দেখে নিতে হবে। নূন্যতম ট্রান্স ফ্যাট থাকলেও সে খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

আরো পড়ুন  ছুটির দিনের ৮টি বিশেষ হেলথ টিপস

৫. অ্যালকোহল

অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ লিভারের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই অতিরিক্ত মাত্রাটা ঠিক কত তা অনেকেই ঠাহর করতে পারেন না। তাই চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মনের অজান্তে অনেকে মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ করে ফেলেন। অ্যালকোহল লিভারের জন্য অতিশয় বিপদ ডেকে আনতে পারে। সুতরাং লিভারের সুস্থতায় অ্যালকোহল গ্রহণ পরিহার করাই শ্রেয়।

৬. প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল গ্রহণ

আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’ শাক-সবজি ও ফল-মূল থেকেই গ্রহণকরা উচিত। লাল, কমলা ও হলুদ রঙের সবজি এবং তাজা ফল-মূলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলোর পরিবর্তে প্রয়োজন ছাড়া ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কারন ক্যাপসুলে ভিটামিন ‘এ’ অনেক বেশি মাত্রায় থাকে। ফলে লিভারের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তাই ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

৭. এসিটামিনোফেন জাতীয় ওষুধ

কোমর ব্যথা, মাথা ব্যথা বা ঠাণ্ডা জনিত ব্যথার ক্ষেত্রে আমাদের সবারই ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণের প্রবণতা খুব বেশি। তবে এসব ওষুধ সঠিক মাত্রায় গ্রহণ করাটা জরুরী। কারন প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করলে তা লিভারের উপর চাপ ফেলে। বিশেষ করে যেসব ওষুধে এসিটামিনোফেন থাকে সেগুলো লিভারের কার্যক্ষমতার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ কারনে সেবনের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে সঠিক মাত্রায় এসব ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।

৮. ভুলবশত কিংবা অজান্তেই লিভারে রোগ ছড়াতে পারে

রোগীর শরীরে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা সুঁই কখনো কখনো ডাক্তার কিংবা নার্সের হাতে ফুঁটে যেতে পারে। এছাড়া যারা শিরাপথে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে তারা একই সুঁই বা সিরিঞ্জ কয়েকজন ব্যবহার করে। এভাবে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই সাথে সাথে রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। মা যদি হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তবে তা সন্তানের দেহেও ছড়াতে পারে। তাই হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত মায়ের সন্তানেরও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।