বিশ্লেষণ

ইনফেকশন প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার: কখন এবং কেন?

সহকারী অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ইনটেনসিভ কেয়ার বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এবং রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মিরপুর, ঢাকা।

রোগীর দেহে ইনফেকশন বা সংক্রমণ ঠেকাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে সার্জারির আগে-পরে এর গুরুত্ব অনেক। কিন্তু এখন হর-হামেশাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই বিষয়ে বিস্তারিত না জানা থাকলে অ্যান্টিবায়োটিকের ভুল ব্যবহারে ক্ষতি হতে পারে রোগীর।

সার্জিক্যাল অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিস: 

সার্জিক্যাল অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিস (Surgical Antibiotic Prophylaxis) বলতে অপারেশনের ক্ষতস্থানে ইনফেকশন প্রতিরোধে (Prevention of Surgical Site Infection [SSI]) অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহারকে বুঝায়। সাধারণত অপারেশনের পূর্বে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে অজ্ঞান করার সময় শিরাপথে (Intravenous or IV) এই অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়। অপারেশনের সময়কাল ৪ ঘন্টার কম হলে একটিমাত্র অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজই যতেষ্ট। উল্লেক্ষ্য সার্জিক্যাল প্রোফাইলেকটিক অ্যান্টিবায়োটিক অপারেশন পরবর্তী অন্যান্য ইনফেকশন যেমনঃ নিউমোনিয়া (Pneumonia), সেপটিসেমিয়া (Septicemia) ইত্যাদি প্রতিরোধ করতে পারে না। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে তা রোগীর কোন ধরনের উপকারে আসে না। বরং এতে রোগীর অনাকাঙ্খিত চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, এ কারণে রোগীর দেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী বিপদজনক রোগ-জীবাণুর (Antibiotic Resistant Bacteria or Superbug) জন্ম হয়। যা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

ছবি: প্রোফাইলেকটিক অ্যান্টিবায়োটিক অপারেশনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে বন্ধ করে দিতে হবে।

আমেরিকান একাডেমি অফ ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান (American Accademy of Family Physician) এর মতে এই প্রোফাইলেকটিক অ্যান্টিবায়োটিক অপারেশনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে বন্ধ করে দিতে হবে। তবে হার্ট ও বুকের অপারেশন (Cardio-thoracic Surgery)-এর ক্ষেত্রে তা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত সিডিসি গাইডলাইনেও (Centers for Disease Control and Prevention Guideline for the Prevention of Surgical Site Infection, 2017) একই কথা বলা হয়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিসের অন্যান্য ব্যবহার:

মেডিক্যাল লিটারেচার ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিস বলতে মূলত সার্জিক্যাল অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিস কেই বুঝায়। তাহলে কি অন্য কোন ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিস ব্যবহারের সুযোগ নেই? এবিষয়ে আরো কিছু খোজাখুজি ও পড়াশুনার পর আমি যা পেলাম তা হচ্ছে আরও কিছু ক্ষেত্রে ইনফেকশন প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিস ব্যবহার করার রিকমেন্ডেশন আছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে: যেসব বাচ্চাদের ঘন ঘন মূত্রনালীতে সংক্রমণ বা ইউরিনের ইনফেকশন (Urinary Tract Infection) হয় তাদের ইনফেকশন প্রতিরোধ করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং স্বল্পমাত্রায় নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো যেতে পারে। এতে মূত্রনালীতে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কমে আসে।

ছবি: ইনফেকশন প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইলেক্সিস ব্যবহার করা যায়।

যেসব রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম (Immuno-compromised) যেমন ক্যান্সারে আক্রান্ত (Cancer Patient) রোগী, এইচআইভি রোগী (AIDS patient), ক্যান্সারের জন্য কেমোথেরাপি চিকিৎসা পাচ্ছে এমন রোগী কিংবা রক্তে শ্বেতকণিকা কমে গেলে (White Blood Cells or WBC) প্রোফাইলেকটিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যায়। এটা রোগীর ইনফেকশনের ঝুঁকি কমাতে পারে।

আরো পড়ুন  কি খাচ্ছেন: খাবার নাকি বিষ?

তাছাড়া রিউমেটিক ফিভার (Rheumatic Fever) বা বাতজ্বরে আক্রান্ত রোগীর হার্ট বা হৃদপিণ্ডের ভালবের ক্ষতি রোধে, কিছু কিছু জন্মগত হার্টের রোগে আক্রান্ত রোগীদের হার্টের ইনফেকশন প্রতিরোধে (Prevention of Infective Endocarditis), টিউবারকুলোসিস (Tuberculosis or TB) বা যক্ষায় আক্রান্ত মায়ের নবজাতক সন্তানের যক্ষা প্রতিরক্ষায়, মেনিংগোকক্কাল সেপ্টিসেমিয়া নামক মারাত্মক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা ডাক্তার, নার্স ও রোগীর স্বজনদের ঐ রোগের প্রতিরোধে স্বল্প মাত্রায় নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বহুদিন আগে থেকেই বৈজ্ঞানিক ভাবে স্বীকৃত।

স্বীকৃত এসব রোগ ব্যতিত অন্য কোন ক্ষেত্রে ইনফেকশন হওয়ার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করে ইনফেকশন প্রতিরোধ করা যায় না। বরং এর ফলে প্রকৃত ইনফেকশনের সময় ঐ অ্যান্টিবায়োটিক আর কার্যকর থাকে না। এভাবে অতিব্যবহারে ও অপব্যবহারে দিন দিন সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক সমূহ কার্যকারিতা হারাচ্ছে, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন অত্যাধুনিক অ্যান্টিবায়োটিকও অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে।

মূলত ইনফেকশন প্রতিরোধ করা যাবে এই ধারণা থেকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই হাসপাতালে ভর্তির পর রোগী কিংবা রোগীর আত্মীয়স্বজন ডাক্তারকে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। হাসপাতালে ভর্তি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে আইসিইউ-তে ভর্তি হওয়া গুরুতর অসুন্থ ও সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে প্রোফাইলেকটিক অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া যেতে পারে। এটা ঐসব রোগীর ইনফেকশনের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে।

মনে রাখতে হবে, কেবলমাত্র ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ইনফেকশন হলেই কেবল অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা ভাইরাস, ফাঙ্গাস সহ অন্যান্য রোগজীবানুর চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।