খাদ্য ও পুষ্টি

খাবারের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর ৮টি উপায়

পুষ্টিবিদ ও গবেষক, জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ অফিস।

মানব জীবনে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ নতুন কিছু নয়। জীবনযাত্রার উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের জীবনে মানসিক চাপ বেড়েই চলছে। দৈনন্দিন জীবনে বাড়তে থাকা এই স্ট্রেস ম্যানেজ করতে হয়ত আপনি বেছে নিয়েছেন বিভিন্ন পন্থা। কিন্তু ডায়েটও হতে পারে এই বাড়তি স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি হাতিয়ার। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টে ডায়েটের ভুমিকা নিয়েই আলোচনা করবো। চলুন তবে শুরু করা যাক।

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টে ডায়েট কিভাবে কাজ করে?

খাদ্য আপনার স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে অনেকভাবেই কাজ করে। পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় কমফোর্ট ফুড বলে একটা কথা আছে। যে খাবারটি আপনার খুবই পছন্দ, সে খাবার খেলে আমাদের ব্রেইনে সেরেটনিন নামক হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। যা আমাদের মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। অন্যান্য কিছু খাদ্য আছে যা আমাদের কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নামক স্ট্রেস হরমোনগুলোর প্রভাব কমিয়ে দেয়, যা বিপরীতভাবে আমাদের স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টে সাহায্য করে থাকে। এছাড়াও সামগ্রিকভাবে উচ্চপুষ্টিমান সম্পন্ন এবং স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও ব্যাপক ভূমিকা রাখে। আসুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক কোন কোন খাবারগুলো আমাদের স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

ছবি: জীবনযাত্রার উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের জীবনে মানসিক চাপ বেড়েই চলছে।

 

১. বেশি করে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট খানঃ সকল ধরনের কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবারই আমাদের ব্রেইনে সেরেটনিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট, যেগুলো হজম করতে বেশি সময়ের দরকার হয়, সেগুলো ভাল কাজ করে। এক্ষেত্রে ঢেঁকি-ছাটা শস্য, পাস্তা এবং সকালের নাস্তায় ওটমিল দারুন কাজের। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটের আরেকটি গুণ হচ্ছে এটি ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতেও খুব কাজের।

২. অতিরিক্ত সিম্পল কার্বোহাইড্রেট পরিত্যাগ করুনঃ সিম্পল কার্বোহাইড্রেট যেমনঃ চিনি, মিষ্টি বা মিষ্টিজাত খাবার, ফাস্ট ফুড, সুইট ড্রিংকস ইত্যাদি থেকে দূরে থাতুন। কারণ এ ধরনের খাবারগুলো শরীরে গিয়ে খুব তাড়াতাড়ি হজম হয়ে যায়। আর এতে করে চড়া মাত্রার সেরেটোনিন আমাদের ব্রেইনে কাজ শুরু করে বটে, কিন্তু পেট খুব দ্রুত ফাকা হয়ে যায় বলে আবার খানিক বাদেই থেমে যায়। এতে করে স্ট্রেস বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং দৈনিক খাবার তালিকায় এসব খাবার কম রাখাই শ্রেয়।

৩. কমলালেবু স্ট্রেস কমায়ঃ কমলালেবুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি স্ট্রেস হরমোন কমাতে ও একই সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করে। উচ্চরক্তচাপ সম্পন্ন একদল রোগীর উপর একটি গবেষণা করে দেখা গেছে যে, কাজের প্রেশারে কিংবা স্ট্রেসে থাকা অবস্থায় ভিটামিন সি খেলে তা শরীরের উচ্চরক্তচাপ ও অতিরিক্ত কর্টিসলকে(একটি স্ট্রেস হরমোন) স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসতে সহায়তা করে। সুতরাং, দৈনিক একটি করে কমলালেবু আপনার খাবার তালিকায় রাখুন।

ছবি: প্রতিদিনকার খাবারে রঙিন শাক-সবজি থাকলে তা আপনাকে সতেজ এবং কর্মক্ষম রাখবে।

৪. বেশি করে রঙিন শাক-সবজি খানঃ শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে তা শারীরিক দুর্বলতা ও মাথাব্যথা ঘটাতে পারে। প্রতিদিনকার খাবারে রঙিন শাক-সবজি থাকলে তা আপনার শরীরে ম্যাগনেসিয়াম লেভেল স্বাভাবিক রাখবে। এতে করে আপনি প্রতিনিয়ত সতেজ এবং কর্মক্ষম থাকবেন। শাক-সবজির ক্ষেত্রে বাঁধাধরা কোন নিয়ম নেই। যে কোন ধরনের লাল বা সবুজ শাক-সবজি আপনি খেতে পারেন।

আরো পড়ুন  যে ১২টি কারনে নিয়মিত মধু খাবেন

৫. সামুদ্রিক মাছ স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে উপকারীঃ সামুদ্রিক মাছ, সেটা যে নামেরই হোক না কেন, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টে বেশ উপকারী। সামুদ্রিক মাছে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড স্ট্রেস হরমোন নিয়ন্ত্রণ করা সহ হৃদরোগ বা হার্ট ডিজিজ, ডিপ্রেশন এবং প্রিমেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোম (PMS) এর ঝুকি কমায়। সপ্তাহে অন্তত দুই বার ১০০গ্রাম করে সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন।

৬. স্ট্রেস কমাতে ব্ল্যাক-টিঃ যে কোন ক্লান্তিদায়ক কাজ থেকে ঝটপট আরাম পেতে এক কাপ ব্ল্যাক টি’র কোন বিকল্পই হয় না। একটি গবেষণায় একবার একদল লোক যারা দৈনিক চার কাপ চা খায়, তাদের সাথে অন্য আরেকদল লোকের তুলনা করা হয়েছিল, যারা চা’য়ের স্থলে অন্য কোন পানীয় পান করেন। ফলাফলে দেখা গেছে, যারা ব্ল্যাক টি খেয়েছেন তাদের শরীরে কর্টিসল নামক হরমোনের মাত্রা অন্যদল লোকের তুলনায় কম। সুতরাং, ঝটপট গরম গরম এক কাপ ব্ল্যাক টি হতে পারে আপনার স্ট্রেস কমানোর হাতিয়ার। তবে, চায়ে চিনির ক্ষেত্রে একটু সতর্ক থাকবেন।

৭. স্ট্রেস কমাতে কাঁচা সবজি খেতে পারেনঃ অনেকেই কাঁচা সবজি যেমনঃ শশা, গাজর, মূলা থেকে শুরু করে ঢেঁড়স পর্যন্ত খেয়ে থাকেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে স্ট্রেস কমাতে এ ধরনের কাঁচা সবজী কিন্তু বেশ উপকারী। পাশাপাশি এভাবে কাঁচা সবজি চিবিয়ে খেলে দাঁতের মাড়ি শক্তিশালী হয়।

৮. রাতের খাবারে নিয়ম মেনে চলুনঃ অনেকে রাতের বেলা বেশ ভারী খাবার খেয়ে ঘুমাতে চলে যান। এটি একদমই অনুচিত। মনে রাখবেন, সকালে খেতে হবে রাজার মত, দুপুরে খান যোদ্ধার মত, আর রাতে খান তপস্বীর মত। রাতে হালকা খাবার খেলে পর্যাপ্ত সেরেটোনিন আপনার সুন্দর ঘুমে সহায়তা করবে। পক্ষান্তরে ভারী খাবার খেলে বুক জ্বালাপোড়া, গ্যাসের সমস্যা, অসুস্থতাসহ হার্টের মারাত্মক অসুখের মধ্যে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সুতরাং একটু বুদ্ধি করে খাবার দাবার গ্রহন করলেই কিন্তু আপনি স্ট্রেস থেকে মুক্ত হতে পারেন প্রাকৃতিকভাবেই। নিয়ম মেনে চলুন, সুস্থ থাকুন।