বিশ্লেষণ

কুরবানীর মাংস খাওয়ার সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখা দরকার

কো-ফাউন্ডার ও সম্পাদক, সুস্বাস্থ্য ২৪।

কুরবানীর ঈদ মানেই রেড মিট (Red Meat) বা লাল মাংস। গরু, খাসি, উট, দুম্বা, মহিষ বা ভেড়ার মাংসকে রেড মিট বা লাল মাংস বলা হয়। রেড মিটে প্রচুর পরিমাণে সম্পৃক্ত চর্বি (Saturated fat) এবং এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল থাকে। রেড মিটের স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত চর্বি হৃদরোগ এবং স্তন ও কোলন ক্যন্সারের জন্য দায়ী। এছাড়া রেড মিট ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় বলেও বেশ কিছু গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে ৪.৫ আউন্স (১২৮ গ্রাম) বা তার থেকে বেশি পরিমাণে লাল মাংস খান তাদের হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। মূলত গরু বা খাসির মাংসে কার্নিটিন (Carnitine) নামক এক ধরনের খাদ্য উপাদানের আধিক্য থাকে। আমাদের খাদ্যনালীতে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়া এই কার্নিটিনকে রূপান্তরিত করে বিশেষ ধরনের যৌগ তৈরী করে, যা রক্তনালীকে শক্ত করে তোলে এবং রক্তনালীর পুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে দেহের রক্তনালীগুলো সরু হয়ে আসে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, গরুর মাংসে কার্নিটিন তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।

তবে রেড মিটের উপকারী দিকও কম নয়। এতে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। প্রতি ৩ আউন্স গরুর মাংসে জীবন ধারণের জন্য ১০টি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান (Essential nutrients) থাকে। রেড মিট আয়রন (Iron)-এর দারুণ উৎস। রেড মিটের আয়রন শরীরে খুব সহজেই শোষিত হয়। এ কারণে প্রাপ্ত বয়স্ক নারী ও গর্ভবতী মা’দের আয়রনের ঘাটতি পূরণে রেড মিট বিশেষভাবে সহায়ক। এছাড়া রেড মিটে ভিটামিন বি-১২ (Vitamin B-12) এবং জিংক (Zinc) থাকে। ভিটামিন বি-১২ দেহের স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তের লোহিত রক্তকণিকাকে সুস্থ রাখে। আর জিংক দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। রেড মিটের প্রোটিন হাড়ের গঠন ও মাংসপেশী তৈরীতে অপরিহার্য।

ছবি: রান্না করা গরুর মাংস

ছবি: রান্না করা গরুর মাংস

কুরবানীর সময় তাই মাংস খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। দিনে ৭০ থেকে ৭৫ গ্রামের বেশি রেড মিট না খাওয়াই উত্তম। এর সাথে সাথে যথেষ্ট পরিমাণে সালাদ এবং সবুজ শাক-সবজি খেতে হবে। অনেকে কুরবানীর সময়টাতে শুধুমাত্র রেড মিট খেয়ে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে থাকেন। অন্যান্য প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন: মাছ, মুরগী, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলেন। কিন্তু কুরবানীর মাংস দিনে সর্বোচ্চ দুই বেলার বেশি খাওয়া উচিত নয়। বরং অল্প পরিমাণে রেড মিট খেয়ে তার সাথে মাছ, মুরগী, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে।

আরো পড়ুন  মাথাব্যথা মানেই মাইগ্রেন নয়: জেনে নিন মাথাব্যথার আরো ১২টি কারন

খাবারের তালিকায় মাংসের পরিমাণ বেশি হলে কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। এজন্য কুরবানীর সময়টাতে বেশি করে পানি পান করতে হবে। কোমল পানীয় যত এড়িয়ে চলা যায় ততই ভালো। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে আঁশ জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য তালিকায় শাক-সবজি এবং দানাদার খাবার রাখার চেষ্টা করতে হবে। হজমশক্তি বাড়ানোর জন্য দই খাওয়া যেতে পারে।

পাশাপাশি এই সময়টাতে প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন: বোতলজাত মাংস, মাংসের তৈরী প্যাকেটজাত খাবার, বার্গার, পিজ্জা, শর্মাসহ বিভিন্ন ধরনের ফাস্ট ফুড এবং কোমল পানীয় খাবার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রমাণিত, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধিতে রেড মিটের চাইতে এসব খাবারের অবদান অনেক বেশি।

ছবি: গ্রিল করা গরুর মাংস

ছবি: গ্রিল করা গরুর মাংস

অনেকে কুরবানীর মাংস গ্রিলড করে খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ঝলসানোর কারণে রেড মিটে ক্যান্সার উৎপাদনকারী যৌগ তৈরী হয়। যা থেকে পরবর্তীতে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এজন্য মাঝারি মাত্রার তাপে মাংস গ্রিলড করতে হবে। গ্রিলড করার জন্য লিন মিট বা চর্বিহীন মাংস ব্যবহার করতে হবে। প্রতি ৩ আউন্স মাংসে সম্পূর্ণ চর্বি (টোটাল ফ্যাট)-এর পরিমাণ ১০ গ্রামের কম, সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট-এর পরিমাণ ৪.৫ গ্রামের কম এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ ৯৫ মিলি গ্রাম-এর কম হলে তাকে লিন মিট (Lean Meat) বা চর্বিহীন মাংস বলা হয়। আমাদের শরীরের জন্য লিন মিট বা চর্বিহীন মাংস তুলনামূলক কম ক্ষতিকর।

স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনের মাধ্যমেও শরীরের উপর রেড মিটের খারাপ প্রভাব দূর করা যায়। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত শরীরচর্চা করলে রেড মিটের কারণ জনিত রোগের সম্ভাবনা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। কুরবানীর সময়টাতে অনেকে আলসেমির কারণে শরীরচর্চা করতে চান না। কিন্তু শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকলে এবং নিয়ম মেনে ব্যায়াম করলে পরিমিত পরিমাণে রেড মিট খেয়েও সুস্থ থাকা সম্ভব।

কুরবানীর পশু কেনার সময়ও সতর্ক থাকতে হবে। ঘাস খাওয়া পশুর তুলনায় শস্য খাওয়া পশুর শরীরে সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট-এর পরিমাণ বেশি থাকে। ঘাস খাওয়া গরুর দেহে শরীরের জন্য উপকারী ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে  বেশি থাকে। এছাড়া ঘাস খাওয়া পশুদের শরীরে লিন মিট বা চর্বিহীন মাংস বেশি থাকে। তাই কেনার সময় ঘাস খাওয়া গরু বা খাসি কিনলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। এছাড়া কুরবানির পর মাংস কাটার সময় যতটা সম্ভব চর্বি কেটে বাদ দিতে হবে। সম্ভব হলে রান্নার আগে কিছুক্ষণ আগুনে ঝলসে নিয়ে মাংসকে চর্বিমুক্ত করা যেতে পারে।