স্বাস্থ্য

লিভার সিরোসিসের ৬টি কারন ও জটিলতাসমূহ

এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন), এফআরসিপি, এফএসিপি, এফসিসিপি, এমএসসি (হেপাটোলজি)। লিভার বিশেষজ্ঞ। পরিচালক, দি লিভার সেন্টার, ঢাকা।

লিভার সিরোসিস একটি পরিচিত রোগের নাম। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষেরই পরিচিত জনের মধ্যে কেউ না কেউ লিভার সিরোসিসে মারা যাবার ঘটনা অপ্রত্যাশিত নয়। সবার অজান্তেই এই রোগটি প্রাণ সংহারক হিসাবে কাজ করে রোগীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। অথচ আগে থেকে এ রোগের কিছুই টেরই পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি এমন চরম অবস্থায় ধরা পড়ে যে পূর্ণ নিরাময় তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে।

লিভার সিরোসিস কি?

কোন কারণে লিভারের কোষগুলো মারা গেলে সেখানে ফাইব্রোসিস ও নডিউল তৈরী হয় এবং লিভারের স্বাভাবিক আণুবীক্ষনিক গঠন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহৃত হয়। লিভারের ভিতরে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। রক্তের বিভিন্ন রাসায়নিক দূষিত পদার্থ যা লিভার পরিস্কার করে থাকে তা শরীরে জমা হয়ে তখন বিভিন্ন উপসর্গ তৈরি করে। কারণ যাই হোক না কেন এইভাবে সিরোসিস পর্যায়ে উপণীত হয়। পুরো লিভার জুড়ে যদি ফাইব্রোসিস এবং নডিউল তৈরী হয় তখন এটাকে লিভার সিরোসিস বলা হয়।

লিভার সিরোসিসের কারন:

বিভিন্ন কারণে লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসই অন্যতম কারণ। অবশ্য উন্নত দেশে মদ্যপানই সিরোসিসের প্রধান কারণ। এছাড়া আরো কিছু কারন রয়েছে। যেমন:

১. বংশগত জটিলতার জন্য লিভারে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও কপার জমে যাওয়ার জন্যেও সিরোসিস হতে পারে

২. পিত্তনালী র্দীঘ সময় ধরে বন্ধ হয়ে যাওয়া

৩. লিভারের ধমনী বন্ধ হয়ে যাওয়া

৪. শরীরে ইম্যুন সিস্টেমের জন্য এবং কোন কোন ওষুধ, যেমন- মিথোট্রিক্সেট (Methotrexate) দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে সিরোসিস হতে পারে

আরো পড়ুন  যে ৮টি কারনে লিভারের ক্ষতি হতে পারে

৫. ৫-১০% ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিসের কোন কারনই খুজে পাওয়া যায় না, এগুলোকে ক্রিপ্টোজেনিক সিরোসিস বলা হয়।

৬. ‘ইন্ডিয়ান চাইল্ডহুড সিরোসিস’ নামে শিশুদের এক বিশেষ ধরণের সিরোসিস এই উপমহাদেশে কদাচিৎ পাওয়া যায়। তবে আমাদের দেশে ভাইরাসজনিত কারণ এতবেশী প্রকট যে অন্য কারণগুলোকে আর তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না।

রোগের লক্ষণ:

বেশির ভাগ লিভার সিরোসিস জটিলতাসহ ধরা পড়ে। কারণ তার আগে হয়তো টেরই পাওয়া যায় না।তবে সাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে আজকাল উল্ল্যেখযোগ্য সংখ্যক রোগী এ ধরণের জটিলতার আগেই বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথেই ডাক্তারের শরনাপন্ন হয়ে থাকেন। সিরোসিসের লক্ষণসমূহের মধ্যে রয়েছে-

১. ক্লান্তি-ভাব,

২. ওজন কমে যাওয়া,

৩. ক্ষুধামন্দা,

৪. পেট ফেঁপে যাওয়া,

৫. পেটে ব্যথা,

৬. জন্ডিস,

৭. পা ও পেট ফুলে যাওয়া,

৮. নাক, মাড়ি কিংবা খাদ্যনালী ও ত্বকের উপরিভাগে রক্তক্ষরণ হওয়া এবং

৯. পুরুষত্বহীনতা ইত্যাদি।

লিভার সিরোসিসের জটিলতা:

১.  পেটে পানি জমা,

২. মস্তিস্ক বিকৃতি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া,

৩. রক্তবমি ও কালো পায়খানা,

৪. লিভার ক্যান্সার,

৫. পেটস্থ পানিতে ইনফেকশন ইত্যাদি হতে পারে।

৬. ২০- ৬০% ক্ষেত্রে সিরোসিস রোগীরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে।

৭. সিরোসিস রোগীদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বার বার ইনফেকশন দেখা দিতে পারে।

৮. এছাড়া কিডনী অকেজো হয়ে যাওয়া, হৃদপিন্ড ও ফুসফুস আক্রান্ত হতে পারে।

৯. অনিদ্রা এবং ডায়াবেটিসও সিরোসিসের এক ধরণের জটিলতা।

১০. এছাড়া ভাসকুলার স্পাইডার, পামার ইরাইথেমা, পুরুষের অন্ডকোষ ছোট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ থাকতে পারে।