গেঁটেবাত

গেঁটেবাত সম্পর্কে জেনে নিন

শুরু করুন

গেঁটেবাত কি?

গেঁটেবাত খুবই পরিচিত একটি রোগ। এটা মূলত জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির প্রদাহজনিত একধরণের বাতের ব্যথা।

অস্থিসন্ধিতে ‘ইউরিক এসিড’ স্ফটিক জমা হওয়ার ফলে যে প্রদাহ হয় তাকেই গেঁটেবাত বলে।

আমাদের খাদ্য তালিকার কিছু কিছু খাবারে ‘পিউরিন’ নামে এক ধরণের পদার্থ থাকে, যা শরীরের ভেতরে ভেঙ্গে ইউরিক এসিড তৈরি করে। কোন কারনে শরীর থেকে এই ইউরিক এসিড ঠিকভাবে নিষ্কাশন হতে না পারলে তা কিডনি, অস্থিসন্ধির মত জায়গায় গিয়ে জমা হয়। যা থেকে পরবর্তীতে কিডনিতে পাথর, কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া এবং বাতের ব্যথার মত সমস্যা দেখা দেয়।

গেঁটেবাতের লক্ষণসমূহ

  • আক্রান্ত জয়েন্টে হঠাৎ করেই ব্যথা শুরু হয়।
  • তারপর আস্তে আস্তে জায়গাটা ফুলে ওঠে ও লালচে হয়ে যায়।
  • আক্রান্ত স্থানে ধরলে বা স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভূত হয়।
  • আশেপাশের তুলনায় আক্রান্ত স্থানের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকে।
  • কখনো কখনো ব্যথা এত তীব্র হয় যে, আক্রান্ত অস্থিসন্ধিতে কাপড়ের ঘষা লাগলেও ব্যথা করতে পারে।
  • সাধারণত কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে ব্যথা এমনিতেই কমে যায়।
  • কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
  • পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের অস্থিসন্ধিগুলো সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।
  • এছাড়া পায়ের গোড়ালি, হাঁটু, কব্জি, কনুই এবং হাত ও পায়ের অন্যান্য আঙ্গুলও আক্রান্ত হতে পারে।

কাদের হতে পারে?

গেঁটেবাত যে কারো হতে পারে। তবে-
  • নারীদের চেয়ে পুরুষরা গেঁটেবাতে বেশি ভোগেন।
  • নারীদের মধ্যে আবার মেনোপজ বা মাসিক বন্ধ হবার পর গেঁটেবাত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে গেঁটেবাতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
  • বংশগত কারনেও গেঁটেবাত হতে পারে। বাবা-মা’র কারো গেঁটেবাত থাকলে সন্তানের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি।

যেসব কারনে ঝুঁকি বাড়ে

  • স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন
  • অত্যাধিক ওজন বৃদ্ধি (বিশেষত তরুণ বয়সে)
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • অ্যালকোহল গ্রহণ
  • দীর্ঘদিন যাবত কিডনি রোগে ভোগা
  • হাইপোথাইরয়েডিজম রোগ
  • কিছু কিছু ওষুধ যেমন: স্যালিসাইলেট (অ্যাসপিরিন), পাইরাজিনামাইড, ইথামবিউটল, নিকোটিনিক এসিড, সাইক্লোস্পোরিন ইত্যাদি গ্রহণ করা।

কেমন দেখায়?

গেঁটেবাত সবচেয়ে বেশি হয় পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের গোড়ার দিকের অস্থিসন্ধিতে। এ সময় আঙ্গুলের গোড়া ফুলে যায়।

আক্রান্ত হলে হাতের আঙ্গুল, কনুই বা হাঁটুও ফুলে ওঠে। অনেক সময় কনুই কিছুটা বাইরের দিকে বেরিয়ে এসেছে বলে মনে হয়।

বেশি ব্যথা অনুভূত হলে আক্রান্ত অস্থিসন্ধিকে বিশ্রাম দিলে উপকার পাওয়া যায়।

চিকিৎসা না করালে সাময়িকভাবে ব্যথা কমে গেলেও তা বারবার ফিরে আসে। ক্রমান্বয়ে তা আশেপাশের টেন্ডন ও অন্যান্য টিস্যুরও ক্ষতি করে। তাই কখনো কখনো এমনিতেই ব্যথা সেরে গেলেও ডাক্তার দেখানো উচিৎ।

রোগ নির্ণয়ের উপায়

  • সাধারণত কিছুদিন পরপর অস্থিসন্ধিতে, বিশেষত পায়ের বুড়ো আঙ্গুল, গোড়ালি, হাঁটু, কনুই বা হাতের আঙ্গুলে ফুলে যাওয়াসহ ব্যথা অনুভূত হয়। এই ধরণের লক্ষণ দেখা দিলে গেঁটেবাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
  • তবে নিশ্চিতভাবে গেঁটেবাত নির্ণয়ের উপায় হচ্ছে আক্রান্ত অস্থিসন্ধি হতে সিরিঞ্জের মাধ্যমে অস্থিসন্ধি রস (Joint Fluid) সংগ্রহ করে অণুবীক্ষণের নিচে ইউরিক এসিডের স্ফটিক সনাক্তকরণ।
  • এছাড়া রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ জানার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা যেতে পারে।

প্রতিরোধে করণীয়

  • নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে পানি পান করলে গেঁটেবাতের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকা যায়।
  • অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় পরিহার করতে হবে।
  • পিউরিন সমৃদ্ধ খাবার পরিহার করতে হবে। যেমন: কলিজা, মগজ, কিডনি, চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক ইত্যাদি।
  • দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বাড়তি ওজন কমিয়ে ফেলা।

চিকিৎসা

গেঁটেবাতের চিকিৎসায় ওষুধ মূলত দুইভাবে কাজ করে-
  • কিছু ওষুধ আক্রান্ত অস্থিসন্ধির ব্যথা ও প্রদাহ কমিয়ে দেয়। এদের মধ্যে আছে আইবুপ্রোফেন ও এই ধরণের অন্যান্য ব্যথানাশক ওষুধ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ।
  • কিছু ওষুধ রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে একে কিডনি ও অস্থিসন্ধিতে জমা হতে বাধা দান করে। এলোপিউরিনল, প্রোবেনেসিড ও ফেবুক্সোস্ট্যাট এই জাতীয় ওষুধ।
মনে রাখতে হবে, সব ওষুধই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ম মেনে গ্রহণ করতে হবে।