লাইফস্টাইল

সাপে কাটলে তাৎক্ষণিক করণীয় ও চিকিৎসা

ইন্টার্নি চিকিৎসক, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা।

সাপ দেখলে বা সাপের কথা শুনলে গা শিরশির করে না, এমন মানুষ পাওয়া মেলা ভার। অথচ সাপের প্রতি এই ভীতি অনেকাংশেই অহেতুক। গোখরা আর ব্ল্যাক মাম্‌বা ছাড়া কোন সাপই আসলে বিনা প্ররোচনায় মানুষকে কামড়ায় না। আর এ দু’টোর মধ্যে শুধু প্রথমটাই আমাদের দেশে দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া সব সাপই যে বিষাক্ত এমনটাও নয়।

সাপ নিয়ে এই অহেতুক ভীতির ফলে সাপের কামড় নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক কুসংস্কার। সামনে বর্ষাকাল। এই সময়টায় সাপের উৎপাত বছরের যে কোন সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। তাই একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে এবং প্রাথমিক চিকিৎসার দু’-একটি নিয়ম জানা থাকলে তা হয়ে উঠতে পারে জীবন রক্ষাকারী।

সাপে কাটার লক্ষণঃ

১. পাশাপাশি দু’টো ক্ষত থাকে (সাধারণত বিষাক্ত সাপের ক্ষেত্রে)
২. কোন কোন সাপের কামড়ে ক্ষতস্থানে তীব্র ব্যথা থাকতে পারে
৩. ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাত হতে পারে
৪. কোন কোন সাপের কামড়ে ক্ষতস্থান ছাড়াও নাক, মুখ বা শরীরের অন্যান্য স্থান থেকেও রক্তপাত হতে পারে। এমন রক্তপাত খুব বেশি হলে তা জীবনসংহারী হয়ে উঠতে পারে
৫. ক্ষতস্থানের চারপাশে ফুলে যেতে পারে, এমনকি ফোস্কা পড়তে পারে
৬. ক্ষতস্থানের চারপাশের এলাকা কালচে বা নীলচে বর্ণ ধারণ করতে পারে
৭. চোখে দেখা, কথা বলা বা শ্বাস নেয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে
৮. চোখে তীব্র ব্যাথা থাকতে পারে, শরীর অবশ হয়ে আসতে পারে

তাৎক্ষণিক করণীয়:

১. সম্ভব হলে সাপটি দেখতে কেমন তা লক্ষ্য করুন। সাপের বর্ণনা পরবর্তীতে ডাক্তারকে চিকিৎসা পরিকল্পনায় সাহায্য করতে পারে। তবে সাপ দেখার চেষ্টা করতে গিয়ে একেবারেই সময় নষ্ট করা যাবে না।
২. আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনুন। তাকে সাহস দিন। আশেপাশে মানুষজন না থাকলে শরীরের আক্রান্ত অংশ যতটা সম্ভব কম নড়াচড়া করে নিরাপদ স্থানে চলে আসুন।
৩. আক্রান্ত ব্যাক্তিকে শুইয়ে দিন। তার বুকের নিচে কিছু একটা দিয়ে বুকটা উঁচু করে রাখুন।
৪. যতটা সম্ভব শান্ত থাকুন, একদমই নড়াচড়া করবেন না।
৫. আক্রান্ত অঙ্গে ঘড়ি, চুড়ি, নূপুরসহ কোন গহনা বা অন্য যে কোন আঁটোসাটো জামাকাপড় অথবা জুতা-মোজা থাকলে তা খুলে ফেলুন।
৬. পরিস্কার ব্যান্ডেজ বা নরম সুতির কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থানটি ঢেকে দিন।
৭. আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব কম নড়াচড়া করে অতিসত্ত্বর হাসপাতালে নিয়ে যান।

আরো পড়ুন  আত্মহত্যার কারণ এবং প্রতিরোধে ৩টি করণীয়

যে কাজগুলো একেবারেই করা যাবে না:

১. সাপে কাটা রোগীর জীবন বাঁচাতে প্রতিটি মুহূর্তই অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওঝা বা কবিরাজের কাছে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না।
২. ক্ষতস্থানের চারপাশে কিছুটা কেটে দিলে বিষ বের হয়ে যায় বলে এক ধরণের ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। এ কাজ কখনোই করা যাবে না।
৩. মুখ দিয়ে টেনে বিষ বের করার চেষ্টাও কোনভাবেই করা করা যাবে না।
৪. দড়ি বা কাপড় দিয়ে আক্রান্ত হাত/পা কোনভাবেই বেঁধে রাখা যাবে না। এতে উপকারের বদলে ক্ষতিই বেশি হয়।
৫. ক্ষতস্থানে পানি বা বরফ লাগাবেন না।

snake-bite

চিকিৎসা:

সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারলে সাপের কামড়ের চিকিৎসা মোটেও জটিল কিছু নয়। একটি সাধারন এন্টিভেনোম ইনজেকশন আর তার সাথে একটি এন্টি-টিটেনাস সিরাম ইঞ্জেকশনই যথেষ্ট একজন রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য। আমাদের দেশে শুধুমাত্র শঙ্খচূড় সাপ ছাড়া আর প্রায় সব বিষাক্ত সাপেরই এন্টিভেনোম ইনজেকশন বাজারে পাওয়া যায়। আর শঙ্খচূড় শুধুমাত্র রাজশাহী অঞ্চলেই দেখা যায়। তাই, সাপে কামড়ালে ভয় পেয়ে দিশেহারা না হয়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে উপরের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

সাপের কামড় থেকে বেঁচে থাকার কিছু টিপস:

১. আশেপাশে কোথাও কোন সাপ দেখলে তাকে চলে যেতে সুযোগ দিন। আঘাত করবেন না, বা এমন কিছু করবেন না যাতে এটি কামড়াতে প্ররোচিত হতে পারে। বহুল প্রচলিত একটা ভুল ধারণা হচ্ছে যে, সাপকে কিছুটা আঘাত করে চলে গেলে সাপ লোকটাকে চিনে রাখে এবং রাতে ওই আঘাতকারী লোকের বাড়ি গিয়ে দংশন করে। মূলত সাপের স্মৃতি শক্তি খুবই কম এবং এ ধরণের অপধারণার কোন ভিত্তিই নেই।
২. ঘরে সাপ থাকার সম্ভাবনা থাকলে, বিশেষত যদি মাটির ঘর হয় এবং তাতে ইঁদুরের গর্ত থাকে, তবে কার্বলিক এসিড কিনে বোতলসহ ঘরের কোনাগুলোতে রেখে দিন। গর্তে কিছুটা কার্বলিক এসিড ঢেলেও দিতে পারেন।
৩. এক গোছা খড়ের ভেতরে কয়েকটি শুকনো মরিচ নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে গর্তে ধোঁয়া দিলেও সাপ থাকলে বেরিয়ে যাবে।
৪. বাড়ির আশেপাশে ঝোপঝাড় থাকলে তা পরিস্কার করে ফেলুন।
৫. বর্ষায় কোথাও ঘুরতে গেলে হাঁটা চলার সময় কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করুন।