স্বাস্থ্য

থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়

মেডিকেল অফিসার, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।

শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ থ্যালাসেমিয়া। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭ হাজারেরও বেশি শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। থ্যালাসেমিয়া মূলত রক্তের রোগ। রোগটি জিনগত হওয়ার কারণে বংশ পরম্পরায় পরবর্তী প্রজন্মে অব্যহত থাকতে পারে। এই রোগের কারণে রক্তে ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন তৈরী হয়। ফলশ্রুতিতে রক্তের লোহিত রক্ত কণিকা ভেঙ্গে যায়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে খুব সহজেই থ্যালসেমিয়া রোগ নির্ণয় করা যায়।

থ্যালাসেমিয়ার ধরণ: থ্যালাসেমিয়া প্রধাণত ২ প্রকার।

বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর: সাধারণত থ্যালাসেমিয়া বলতে থ্যালাসেমিয়া মেজরকেই বুঝায়। এক্ষেত্রে বাবা-মা উভয়েরই জিনে সমস্যা থাকে এবং তা বংশ পরম্পরায় সন্তানের মাঝে প্রকাশ পায়।

বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর: এক্ষেত্রে বাবা অথবা মা যেকোন একজনের দেহে ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকে। এরা মূলত রোগী নয় বরং রোগের বহনকারী। কোন ধরণের উপসর্গ ছাড়াই এরা  সাধারণ জীবন-যাপন করতে পারে। মাঝে মাঝে এদের রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে কোন ধরণের চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন নেই। সাধরণত স্বাভাবিকভাবেই তা সেরে যায়।

লক্ষণ ও উপসর্গ:

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুরা সাধারণত জন্মের প্রথম মাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে। এরপর ধীরে ধীরে তার শরীরে রক্তস্বল্পতা তৈরী হয় যা পরবর্তীতে মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশুর বয়স এক বছর হওয়ার আগেই তার মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণগুলো দেখা দিতে থাকে।

ছবি: শিশুর বয়স এক বছর হওয়ার আগেই তার মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণগুলো দেখা দিতে থাকে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রধান লক্ষণগুলো হচ্ছে:

১. শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
২. অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া
৩. স্বাভাবিক কাজ-কর্মে অনীহা প্রকাশ
৪. খেলা-ধূলার প্রতি আগ্রহ না থাকা
৫. একা একা ঝিম মেরে বসে থাকা
৬. খাবারে অরুচি এবং অনীহা তৈরী হওয়া
৭. শিশু অপুষ্টিতে ভুগতে থাকে
৮. চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া
৯. প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া
১০. পেট ফুলে যাওয়া
১১. পেটে চাকা অনুভূত হওয়া
১২. কখনো কখনো পেটে ব্যথা হতে পারে
১৩. ঘন ঘন অসুখ-বিসুখ হওয়া
১৪. শরীরের তুলনায় মাথা বড় হওয়া
১৫. সমবয়সী অন্য বাচ্চাদের তুলনায় শারীরিক বৃদ্ধি কম হওয়া

আরো পড়ুন  কিডনি রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা: যে বিষয়গুলো সবার জানা প্রয়োজন

চিকিৎসা:

১. ব্লাড ট্রান্সফিউশন (Blood Transfusion) বা রক্ত দেওয়া: থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রধান চিকিৎসা মূলত শরীরে রক্ত দেওয়া বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন করা। আক্রান্ত শিশুকে ১ থেকে ২ মাস পরপর রক্ত দিতে হয়। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে ফ্রেশ লোহিত রক্ত কণিকা পরিসঞ্চালন করা উত্তম। পাশাপাশি শিশুর দেহে আয়রনের আধিক্য কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শমত ওষুধ দেয়া হয়।

২. স্থায়ী চিকিৎসা: থ্যালাসেমিয়া রোগের আধুনিক ও স্থায়ী চিকিৎসা হচ্ছে:

ক. বোন মেরো ট্রান্সপ্লান্টেশন (Bone Marrow Transplantation)
খ. জিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (Gene Replacement Therapy)

প্রতিরোধে করণীয়:

১. সচেতনতা বৃদ্ধি: থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

ছবি: পাত্র বা পাত্রী থ্যালাসেমিয়া জিন বহন করছে কিনা তা বিয়ের পূর্বে পরীক্ষা করে জেনে নেওয়া দরকার।

২. বিয়ের পূর্বে থ্যালাসেমিয়া জিন বহনকারী কিনা তা পরীক্ষা করা: থ্যালাসেমিয়া জিনগত রোগ। এ কারণে বিয়ের পূর্বে পাত্র কিংবা পাত্রী থ্যালাসেমিয়া জিন বহন করছে কিনা তা পরীক্ষা করে জেনে নেওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ে থ্যালসেমিয়া জিন বহনকারী হলে তাদের থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা ২৫ ভাগ। কিন্তু স্বামী বা স্ত্রী যেকোন একজন থ্যালাসেমিয়া জিন বহনকারী হলে স্বাভাবিক বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ ভাগ এবং থ্যালাসেমিয়া জিন বহনকারী শিশু জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা ৫০ ভাগ। এক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নিবে না।

পরিশেষে বলতে হয়, রক্ত পরিসঞ্চালনেই থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রধান চিকিৎসা। কিন্তু অনেক সময়ই রক্ত সংগ্রহ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরী। স্বাভাবিক ও সুস্থ মানুষদের ৩ থেকে ৪ মাস পরপর রক্ত দানে উৎসাহিত করার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগ জনিত শিশুদের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।