মা ও শিশু

গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি: যে বিষয়গুলো অবশ্যই জানা দরকার

এম.ফিল (ইন কোর্স), নিউক্লিয়ার মেডিসিন এন্ড এলাইড সাইন্সেস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

রোগনির্ণয়ের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG) খুবই সহজ এবং প্রচলিত পরীক্ষা। উন্নত প্রযুক্তির কারণে আল্ট্রাসনোগ্রাফির রোগনির্ণয় ক্ষমতাও অনেক বেশি। আর তাই বর্তমান যুগে এই পরীক্ষাটি সবার কাছেই বেশ জনপ্রিয়।

কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রাফি নিয়ে কম-বেশি অনেকেরই কিছু ভুল ধারণা বিদ্যমান। এই ভুল ধারণা একদিকে যেমন রোগীর জন্য ক্ষতিকর, অন্যদিকে তা চিকিৎসকদের সঠিকভাবে রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রোগী-ডাক্তার নির্বিশেষে তাই আল্ট্রাসনোগ্রাফির ব্যাপারে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের আল্ট্রাসনোগ্রাফির ব্যাপারে সবারই খুব সতর্ক থাকা দরকার।

ছবি: 2D স্ক্যানিং

ছবি: 2D স্ক্যানিং

গর্ভবতী মায়েদের আল্ট্রাসনোগ্রাফির জন্য ডাক্তাররা মূলত ”প্রেগনেন্সি প্রোফাইল উইদ কালার ডপলার” বা ”অ্যানোমালি স্ক্যানিং (2D, 3D, 4D স্ক্যানিং)”-এর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। চিকিৎসকরা সাধারণত 2D স্ক্যানিং করে থাকেন। এছাড়া গর্ভের শিশুর (ফিটাল) মুখাবয়ব দেখার জন্য 3D 3Dস্ক্যানিং ব্যবহার করা হয়। এছাড়া অনেকেই 4D অ্যানোমালি স্ক্যানিংও করতে চান। তাদের দাবী, বাচ্চার মুখাবয়ব না দেখলে মনে শান্তি পাওয়া যায় না। অথচ অ্যানোমালি স্ক্যানিং-এর জন্য 2D সবেচেয়ে উত্তম।

সাধারণত 2D-তে  কোন সমস্যা ধরা পড়লে তা নিশ্চিত হবার জন্য 3D বা 4D স্ক্যানিং করা হয়। কিন্তু তার আগে কখনোই 3D বা 4D স্ক্যানিং করা উচিত নয়। আর শুধুমাত্র বাচ্চার মুখাবয়ব দেখার জন্য 3D বা 4D করার প্রশ্নই উঠে না। কেননা এই মুখাবয়ব বাচ্চার আসল মুখাবয়ব না। বরং এটা ইলেক্ট্রনিক সফটওয়্যারের একটা ভার্শন। সুতরাং, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে কাল্পনিক মুখাবয়ব দেখার ফ্যান্টাসি মন থেকে দূর করতে হবে।

যে বিষয়টা জানা সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, এই 3D বা 4D স্ক্যানিং কখন করতে হবে? প্রেগনেন্সির সময় এটা অনেক জনপ্রিয় একটা স্ক্যানিং। খুব অহরহ এটা করতে দেখা যায়। অথচ অযথা এটা করা অনাগত বাচ্চার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ 3D বা 4D-তে খুব উচ্চমাত্রার শব্দ কম্পাঙ্ক ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, এটা 2D থেকে প্রায় হাজার গুণ বেশি, যা অনাগত বাচ্চার সুস্বাস্থ্যের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, কেবলমাত্র 2D-তে কোন সমস্যা ধরা পড়লে তা নিশ্চিত হবার জন্য 3D বা 4D স্ক্যানিং করা যাবে, অন্যথায় না করাই উত্তম।

আরো পড়ুন  জমজ বাচ্চা বা টুইন বেবি কিভাবে হয়: গল্প ও বাস্তবতা

এবার আসি কালার ডপলার নিয়ে। ডপলার মূলত চার প্রকার আছে। তারমধ্যে একটা হচ্ছে কালার ডপলার। এছাড়াও আছে: কন্টিনিউয়াস ওয়েভ ডপলার, পালস ওয়েভ ডপলার এবং পাওয়ার ডপলার। গর্ভাবস্থায় বা প্রেগনেন্সিতে খুব উপকারী স্ক্যানিং হচ্ছে পালস ওয়েভ ডপলার। এটা দিয়ে আমরা নির্দিষ্টভাবে ধমনী এবং শিরার রক্ত প্রবাহের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করতে পারি। এমনকি নিয়মমত ধারাবাহিক স্ক্যানিং করে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে কোন বিশেষ শারীরিক জটিলতা তৈরী হবে কিনা তাও বলে দেয়া সম্ভব।

ছবি: আল্ট্রাসনোগ্রাফি করছেন চিকিৎসক।

ছবি: আল্ট্রাসনোগ্রাফি করছেন চিকিৎসক।

ডাক্তারদের মতে, গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস পর থেকে ডপলার স্ক্যানিং করা ভালো। মনে রাখতে হবে, ডপলার করতে হবে গর্ভধারণের ১ম তিন মাস পরে। কারণ ডপলারেও উচ্চ শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়, যা প্রথম তিনমাসে গর্ভস্থ শিশুর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

প্রশ্ন আসতে পারে, 3D বা 4D স্ক্যানিং এবং ডপলার উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চমাত্রার শব্দ কম্পাঙ্ক ব্যবহার হয়। অথচ চিকিৎসকরা প্রেগনেন্সিতে নির্দিষ্ট সময়ের পর (গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস পর) ডপলার করার কথা বললেও, 3D বা 4D স্ক্যানিং করতে নিরুৎসাহিত করেন কেন?

কারণ, ডপলার করে আমরা যে কোন খারাপ ধরণের শারীরিক জটিলতা সম্পর্কে আগাম জানতে পারি। ফলে পূর্ব থেকেই সতর্ক হয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু 3D বা 4D স্ক্যানিং-এর কোন উপযোগিতা প্রেগনেন্সিতে আদতে একেবারেই নেই। তাই যেখানে কিছু উপকারিতা আছে সেখানে কিছু অপকারিতাকে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যাতে কোন উপকারই নেই সেখানে শুধু শুধু যেচে ডেকে এনে সমস্যা বাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।